
পুজোর আনন্দ মানেই কি দামি রেস্তোরাঁ আর বিলাসবহুল গাড়ির ভিড়? একেবারেই নয়। বরং উৎসবের আসল মজা লুকিয়ে থাকে ছোট ছোট মুহূর্তের উদযাপনে। কলকাতার রাস্তায় স্ত্রী ও ছোট্ট সন্তানকে নিয়ে এক সাধারণ রিকশা সফরে সেই নিখাদ আনন্দই খুঁজে পেয়েছিলেন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট অভিষেক মুখোপাধ্যায়। পুজোর আলোয় সাজানো শহরে রিকশায় বসে রয়েছেন স্ত্রী, আর হাসিতে মেতে উঠেছে ছোট্ট ছেলে। আসলে ছোটবেলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটানো পুজোর যে সুন্দর স্মৃতি আর পারিবারিক শিক্ষা তাঁর মনে গেঁথে রয়েছে, সেটাই নিজের সন্তানের শৈশবে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। এই সাদামাটা আনন্দের ২০ সেকেন্ডের ভিডিয়ো মুহূর্তে মন জয় করে নেয় নেটপাড়ার। স্বয়ং শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েঙ্কাও শেয়ার করেন এই সুন্দর মুহূর্তটি।
কিন্তু এত সুন্দর একটা ভিডিয়ো, এত ভালোবাসায় মোড়া একটা পারিবারিক মুহূর্ত, তা-ও যেন সহ্য হল না একাংশের। সোশাল মিডিয়ায় ধেয়ে এল একের পর এক কটাক্ষ। অভিষেকবাবু পেশায় একজন সফল চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। তা সত্ত্বেও কেউ তাঁকে ‘গরিব’ তকমা দিলেন, তো কেউ আবার তাঁর রূপ ও উচ্চতা নিয়ে উপহাস করলেন। এমনকি, তাঁর স্ত্রী আদৌ সুখী কি না, তা নিয়েও নেতিবাচক মন্তব্য ধেয়ে এল। অন্যের এমন নিখাদ আনন্দ দেখে কেন এত নেতিবাচকতা? কেন এই সুন্দর মুহূর্তটিকেও কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা?
এই বিষণ্ণ মানসিকতার পেছনের কারণ খুঁজতে গিয়ে টিভি নাইন বাংলার কাছে নিজের মতামত জানালেন অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাক্তার রঞ্জন ভট্টাচার্য। তাঁর মতে, অন্যের মুখে হাসি দেখতে না পারার এই প্রবণতা আসলে নিজেদের ভেতরের হতাশারই প্রতিফলন। তিনি বলেন, “নেটদুনিয়ার অন্তর্জালে যে সমস্ত মানুষ রয়েছেন, তাঁরা এখন সামাজিক মাধ্যমের দৌলতে টিপ্পনী কাটতে পিছপা হচ্ছেন না, একবারও ভেবে দেখছেন না যে মানুষটাকে এরকমভাবে চরিত্রহননের চেষ্টা করা হচ্ছে বা নেতিবাচক মন্তব্য করে তার মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। তাতে হয়তো যে মানুষটি কমেন্ট করছে তার মধ্যে একটা অদ্ভুত আনন্দ হয় এবং একটা স্যাডিস্টিক প্লেজার সে পায়।”
এই ‘স্যাডিস্টিক প্লেজার’ বা অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়ার বিকৃত মানসিকতাকে আরও উসকে দিচ্ছে সোশাল মিডিয়ার নিয়ম। কারণ, নেতিবাচক চর্চায় মানুষের আকর্ষণ বেশি। ডাক্তারবাবু বিষয়টি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, “নেগেটিভ কমেন্টে দেখবেন রিপ্লাই বা রেসপন্সটা বেশি আসে… এতে সোশাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম তাকে আবার ঠেলে দিচ্ছে যে আরও তার রিচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।” এই লাইক বা কমেন্টগুলো যেন মস্তিষ্কে নেশার মতো কাজ করে।
আসলে যাঁরা এই ধরনের মন্তব্য করেন, তাঁদের নিজেদের জীবনই হয়তো অন্ধকারে ঢাকা। অন্যের হাসিমুখ তাঁদের নিজেদের ব্যর্থতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এই প্রসঙ্গে ডাক্তার রঞ্জন ভট্টাচার্যের সংযোজন, “কেউ হয়তো তার নিজের মানসিক সমস্যা আছে, যে হয়তো চিরকাল অবসাদগ্রস্ততায় ভুগছে, তার মধ্যে যে ব্যর্থতা রয়েছে, তার মধ্যে যে অসহিষ্ণুতা, ক্ষোভ, সমাজের প্রতি, ব্যক্তিজীবনের প্রতি, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া বা তার নিজের জীবনে দাম্পত্য বা পারিবারিক জীবনে অসন্তোষের কারণে এরকম করছে।”
এই ধরনের আক্রমণ অনেক সময় ভুক্তভোগীর মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। জীবনে পেশাগতভাবে সফল হওয়া আর সুখী হওয়া কখনও এক জিনিস নয়। অর্থ বা সাফল্য দিয়ে সবকিছু মাপা যায় না। অন্যের নির্ভেজাল আনন্দ দেখে খুশি হতে পারাটাই যে সুস্থ মানসিকতার লক্ষণ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।