
আরশোলা (Cockroach) নামটা শুনলেই যেন অনেকের গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। রাতের বেলা রান্নাঘরে জল খেতে গিয়েছেন, আচমকা দেখলেন সিঙ্কের ধার ঘেঁষে উঁকি মারছে এক জোড়া শুঁড়! ব্যস, আর দেখতে হবে না। চিৎকার করে বাড়ি মাথায় করা তখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। এমনিতে সাপের মতো এর মারণ বিষ নেই, বাঘ-ভাল্লুকের মতো কামড়ায় না, এমনকি মশা-মাছির মতো মারাত্মক কোনও রোগও সরাসরি ছড়ায় না। তবুও এই প্রাণীটিকে দেখলে বহু মানুষের, বিশেষত মহিলাদের পিলে চমকে যায়। কখনও কি ভেবে দেখেছেন, এই নিরীহ পতঙ্গটিকে ঘিরে কেন এত আতঙ্ক?
যদি কখনও কাউকে আরশোলার ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে দেখেন, তবে দয়া করে হাসাহাসি করে ব্যাপারটাকে উড়িয়ে দেবেন না বা ন্যাকামি বলে দাগিয়ে দেবেন না। মনোবিদরা বলছেন, সারা বিশ্ব জুড়ে যত ধরনের ‘কমন’ বা সাধারণ ফোবিয়া রয়েছে, তার মধ্যে আরশোলার ভয় বা ক্যাটসারিডাফোবিয়া (Katsaridaphobia) অন্যতম। এই পতঙ্গটিকে দেখলে যদি কারও হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে, প্রবল ঘাম হতে থাকে, হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে যায় এবং সাময়িকভাবে চিন্তা-ভাবনা করার ক্ষমতা লোপ পায়, তবে বুঝতে হবে বিষয়টি মোটেই সাধারণ ভয় নয়। এটি একটি মানসিক পরিস্থিতি, যার জন্য প্রয়োজনে মনোবিদের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এত ক্ষুদ্র একটা প্রাণীকে নিয়ে মানুষের মনে এত আতঙ্ক তৈরি হল কীভাবে? এই বিষয়ে হওয়া মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ভয়ের শেকড় গভীরভাবে লুকিয়ে থাকে শৈশবে। সাধারণত শিশুরা বাড়ির বড়দের দেখেই চারপাশের জগতকে চিনতে শেখে। পরিবারে বাবা-মা বা বয়োজ্যেষ্ঠ কারও যদি আরশোলা নিয়ে অস্বাভাবিক ভীতি থাকে, তবে তা খুব সহজেই বাচ্চাদের মনে সংক্রমিত হয়। বড়দের আতঙ্কিত হতে দেখেই ছোটদের অবচেতন মনে এই ধারণা জন্মায় যে, প্রাণীটি হয়তো সত্যিই অত্যন্ত বিপজ্জনক। এভাবেই এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে এই ভয় ছড়িয়ে গিয়েছে। মহিলারা বেশি নরম মনের হন তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদের প্রতিক্রিয়া হয় চোখে পড়ার মত।
তাছাড়া, আরশোলা মানুষের ‘ডিসগাস্ট রেসপন্স’ বা চরম ঘেন্নার অনুভূতিকে উসকে দেয়। এর চকচকে তেলতেলে শরীর, ওড়ার সময় ডানার ফড়ফড়ানি আওয়াজ, মাটিতে এঁকেবেঁকে চলা এবং হঠাৎ করে উড়ে এসে সটান গায়ে বসার স্বভাব, এই সব কিছুর মধ্যেই এমন একটা অদ্ভুত ব্যাপার রয়েছে যা থেকে অনেকের মনে প্রবল ঘৃণা জন্ম নেয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় এদের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। খাবার ও বাসস্থানের খোঁজে এরা নালা-নর্দমায় ঘুরে বেড়ায়। এদের শরীরে ইউরিক অ্যাসিড জমা থাকে, যে কারণে এদের গা থেকে এক ধরনের উৎকট দুর্গন্ধ বেরোয়। যারা হাঁপানি বা অ্যাজমার সমস্যায় ভোগেন, তাঁদের জন্য আরশোলা বেশ বিপজ্জনক। কারণ এদের গায়ে থাকা অ্যালার্জেন থেকে মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। এটাও মানুষের মনে ভীতি তৈরি করার অন্যতম বড় কারণ।
তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আরশোলা ভীতি কোনও দুর্বলতা নয়। এর পিছনে রয়েছে স্পষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক কারণ। মনোবিদের সাহায্য নিলে এবং কিছু সাধারণ অভ্যাস বা থেরাপির মধ্যে দিয়ে গেলে এই ভয় পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। তাই এরপর থেকে উড়ন্ত আরশোলা দেখলে ভয় পেলেও, অন্তত জানবেন এই ভয়ের আসল কারণটা ঠিক কোথায়!