
প্রিয়জন মৃত্যুশয্যায়। শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসছে। এমন সময় অনেকেই মুখ দিয়ে বড় বড় শ্বাস নিতে শুরু করেন। চোখের সামনে এমন দৃশ্য দেখে মনে হতে পারে, মানুষটির হয়তো খুব তেষ্টা পেয়েছে। গলা শুকিয়ে কাঠ! আর তখনই দ্রুত এক চামচ বা গ্লাস করে জল মুখে ঢেলে দেওয়া হয়। যুগ যুগ ধরে সমাজে এই প্রথা চলে আসছে। বিশ্বাস, এতে মানুষটি শান্তি পাবে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? আবেগের বশে দেওয়া এই কয়েক ফোঁটা জলই কি শেষ মুহূর্তে চরম যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?
চিকিৎসা বিজ্ঞান কিন্তু একেবারে অন্য কথা বলছে। চিকিৎসক শরণ্য সান্ন্যাল সম্প্রতি তাঁর একটি ভিডিয়োতে এই নিয়ে মুখ খুলেছেন। বিজ্ঞান বলছে, শেষবেলায় মুখে জল দিলে উপকারের চেয়ে ক্ষতি বেশি হতে পারে। কিন্তু কেন এমনটা হয়? শান্তির জন্য দেওয়া কয়েক ফোঁটা জল কীভাবে বিপদের কারণ হতে পারে? আসুন সহজ ভাষায় গোটা বিষয়টা জেনে নেওয়া যাক।
আবেগের বশে যে মারাত্মক ভুলটি হয়
মানুষ যখন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়, তখন শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে যায়। শরীরের কলকব্জাগুলো ধীরে ধীরে কাজ করা বন্ধ করে দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, মানুষটি মুখ হাঁ করে শ্বাস নিচ্ছেন। এই দৃশ্য দেখে পরিবারের লোকেদের মনে হতে পারে, মানুষটির হয়তো খুব তেষ্টা পেয়েছে। আর ঠিক সেই সময়েই মুখে জল দেওয়ার তাড়া পড়ে যায়। গ্লাস বা চামচ করে জল মুখে ঢেলে দেওয়া হয়।
ঠিক কী বলছেন চিকিৎসক?
কিন্তু চিকিৎসক শরণ্য সান্যাল তাঁর ভিডিয়োতে পরিষ্কার জানিয়েছেন, এখানেই সবচেয়ে বড় ভুল হয়। এই সময় জল গেলার ক্ষমতা মানুষ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে। গলার পেশি আর কাজ করে না। এই অবস্থায় মুখে জল ঢাললে তা পেটে না গিয়ে সোজাসুজি শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে চলে যেতে পারে।
অনেক সময় দেখা গিয়েছে, ভুল করে ফুসফুসে জল যাওয়ার ফলে রোগীর মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। এতে শেষ সময়ে মানুষটির কষ্ট আরও কয়েক গুণ বেড়ে যায়। অর্থাৎ, যাঁকে শান্তি দেওয়ার জন্য জল দেওয়া হল, সেই জলেই তাঁর বিদায়বেলা চরম যন্ত্রণার হয়ে ওঠে।
তবে কি জল দেওয়া একেবারে বারণ?
চিকিৎসকরা বলছেন, একেবারেই না। জল দেওয়ারও একটা নিয়ম রয়েছে। গ্লাস বা চামচ করে জল ঢালা একদম উচিত নয়। চিকিৎসক শরণ্য সান্যালের মতে, এর বদলে একটা পরিষ্কার তুলো বা নরম কাপড় জলে ভিজিয়ে প্রিয়জনের ঠোঁট একটু ভিজিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
এতে তাঁর ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়ার অস্বস্তি দূর হবে। আবার ফুসফুসে জল যাওয়ার কোনও বিপদও থাকবে না। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলেও এই সামান্য ভেজা ভাবটাই তখন তৃষ্ণা মেটানোর জন্য যথেষ্ট।
পুরনো বিশ্বাস আর রীতিনীতির সঙ্গে বিজ্ঞানের কোনও লড়াই নেই। শুধু দরকার একটু সচেতনতা। প্রিয়জনের শেষ সময়টা শান্তিতে কাটুক, সেটাই কাম্য। তাই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে, আবেগের পাশাপাশি চিকিৎসকদের কথাও মাথায় রাখতে হবে। একটু সতর্ক হলেই একটা মানুষের শেষ সফরটা অনেক বেশি আরামের হতে পারে।