
পকেটে গোল করে পাকানো লাল কাগজের একটা ছোট্ট রোল। আর হাতে ধরা একটা খেলনা বন্দুক। ব্যস, পুজোর কটা দিন পাড়ার মোড়ে নিজেকে দুঁদে পুলিশ অফিসার ভাবার জন্য এই দুটো জিনিসই যথেষ্ট ছিল! ট্রিগার চাপলেই ‘ফাটাং’ আওয়াজ, আর চোখের সামনে এক ঝলক আলোর ফুলকি। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ত অদ্ভুত একটা বারুদের গন্ধ। থিম পুজোর এই যুগে সেই গন্ধটা আজকাল আর সেভাবে পাওয়া যায় না। নব্বইয়ের দশক বা তার আগে যাঁরা দুর্গাপুজো দেখেছেন, তাঁদের কাছে এই ক্যাপ বন্দুক নিছক খেলনা নয়, নস্টালজিয়া। সেকাল থেকে একালে উৎসবের জাঁকজমক অনেক বেড়েছে। পুজোর দিনগুলোতে পাড়ার মোড়ে মোড়ে বন্দুক হাতে সেই খুদে পুলিশদের দৌরাত্ম্য আজ আর তেমন চোখে পড়ে না। তবে বাঙালির এত আদরের এই খেলনা বন্দুক আসলে কোথা থেকে এসেছিল?
গল্পটা বাংলার নয়। শুরুটা হয়েছিল আমেরিকার মাটিতে। সময়টা ১৮৬০ সালের মাঝামাঝি। আমেরিকায় তখন ভয়ংকর গৃহযুদ্ধ চলছে। চারদিকে কেবল বারুদ আর অস্ত্রের ঝনঝনানি। চারপাশের এই যুদ্ধের পরিবেশ দেখে ছোটদের মনেও বন্দুক নিয়ে এক অদ্ভুত কৌতূহল তৈরি হয়েছিল। বাচ্চারাও বড়দের মতো হাতে অস্ত্র তুলে নিতে চাইত। ঠিক এই জায়গাতেই বড়সড় ব্যবসায়িক সুযোগ দেখতে পায় আমেরিকার কয়েকটি নামী বন্দুক প্রস্তুতকারী কোম্পানি। তারা বুঝতে পারে, বাচ্চাদের এই কৌতূহল আর যুদ্ধের উন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে যদি আসল বন্দুকের মতো দেখতে কোনও খেলনা বানানো যায়, তবে তা দারুণ বিক্রি হবে। মূলত ব্যবসার প্রসার, নতুন বাজার তৈরি এবং ছোটদের বিনোদনের কথা মাথায় রেখেই তারা প্রথম খেলনা বন্দুক তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রথমদিকে এই খেলনা সেভাবে সাড়া ফেলতে পারেনি। কিন্তু ১৯০০ সাল থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। সিনেমায় তখন প্রচুর নকল বন্দুক ব্যবহার করা হচ্ছে। অবিকল আসল বন্দুকের মতো দেখতে হওয়ায় ছোটদের মধ্যেও এর ক্রেজ বাড়তে থাকে। তবে একটা বড় সমস্যা দেখা দিল। সেই বন্দুকগুলিতে এক বিশেষ ধরনের ডার্ট বা গুলি ব্যবহার করা হত। যা নিয়ে খেলতে গিয়ে শিশুরা প্রায়শই আঘাত পেত। নির্মাতারা পড়লেন ঘোর বিপাকে। এমন কিছু বানানোর কথা ভাবতে হল, যা শিশুদের জন্য সুরক্ষিত হবে, অথচ ট্রিগার চাপলে আওয়াজ হবে আসলের মতোই। এই ভাবনা থেকেই বাজারে এল ক্যাপ বন্দুক। লাল কাগজের রোলের মধ্যে থাকা সামান্য বারুদ বন্দুকের ভেতর সেট করে ট্রিগার চাপলেই ফাটাং আওয়াজ, সঙ্গে আলোর ফুলকি।
১৯৩০-এর দশকে এই বন্দুক দুনিয়াজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। সেকালের ম্যাটিনি আইডল, যেমন রয় রজার্স বা মার্শাল ম্যাট ডিল্লনের মতো তারকাদের নামেও একাধিক মডেল তৈরি হয়। কোল্ট ৪৫, পাইওনিয়ার বা টেক্সানের মতো কোম্পানিগুলির বন্দুক হু হু করে বিক্রি হতে থাকে। বাংলায় এই বন্দুক প্রথম এসেছিল ১৯৬০ সাল নাগাদ। শুরুতে খুব একটা চল না থাকলেও, ১৯৬৫ সালের পর থেকে ভারতের খেলনার বাজারে কার্যত ঝড় তোলে এই ক্যাপ বন্দুক। এরপর টানা ৪০ থেকে ৪৫ বছর দুর্গাপুজো মানেই হয়ে দাঁড়ায় ক্যাপ বন্দুকের আওয়াজ।
আজ সেই দিনগুলো যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। এখনকার পুজোয় আলোর রোশনাই আছে, থিমের চমক আছে, শুধু কমে গিয়েছে সেই চেনা বারুদের গন্ধ। আজকের প্রজন্ম মোবাইল আর ভিডিয়োগেমের স্ক্রিনেই বন্দুকের আওয়াজ শুনতে বেশি অভ্যস্ত। ক্যাপ বন্দুক হয়তো আজও চিরতরে হারিয়ে যায়নি। বাজারের কোনও এক কোণে আজও হয়তো ধুলো মেখে পড়ে থাকে। ক্রেজ হয়তো নিভু নিভু। তবুও পুজোর সকালে চোখ বুজলে আজও যেন সেই ‘ফাটাং’ আওয়াজ আর লাল রোলের গন্ধটা ফিরে আসে। মনে করিয়ে দেয় ফেলে আসা ছেলেবেলার এক অমলিন নস্টালজিয়া।