
শীতের সকালে বাজার থেকে আনা দামি মধুর বয়ামটা খুলতেই চক্ষু চড়কগাছ! বোতলের তরল মধু একেবারে জমে শক্ত হয়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে অনেকেই ভেবে বসেন, দোকানদার নির্ঘাত ভেজাল গছিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? মধু জমে যাওয়া মানেই কি তা নকল? নাকি খাঁটি মধু চেনার আসল চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে এখানেই?
সর্দি-কাশি কমানো থেকে শুরু করে ওজন ঝরানো- সবেতেই মধুর কদর রয়েছে ঘরে ঘরে। তাই বলে কি টাকা দিয়ে ভেজাল জিনিস খাবেন? অনেকেই খাঁটি মধু চিনতে জলের গ্লাস, পেপার টাওয়াল বা আগুনের সাহায্য নেন। প্রচলিত ধারণা হল, এক গ্লাস জলে মধু ফেললে তা যদি সঙ্গে সঙ্গে মিশে যায়, তবে তা ভেজাল। আবার চামচে করে আগুনে ধরলে যদি তা ক্যারামেলাইজ হয়ে যায়, তবে তা খাঁটি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন একেবারে অন্য কথা।
ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশনিস্টদের মতে, এই ধরনের ঘরোয়া টোটকা দিয়ে মধুর আসল বিশুদ্ধতা প্রমাণ করা কোনও মতেই সম্ভব নয়। জলের গ্লাস বা পেপার টাওয়ালের পরীক্ষায় ১০০ শতাংশ ভরসা করা যায় না। ভেজাল ধরতে পারে একমাত্র ল্যাবরেটরি টেস্ট।
তা হলে সাধারণ মানুষ খাঁটি মধু চিনবেন কী করে? বাড়িতে বসে তো আর ল্যাব টেস্ট সম্ভব নয়! তাই ভরসা রাখতে হবে নিজস্ব বুদ্ধি ও কয়েকটি সহজ উপায়ের উপর:
প্রথমেই খেয়াল রাখুন মধু জমছে কি না। মধু জমে যাওয়া কিন্তু ভেজালের লক্ষণ নয়, বরং এটি খাঁটি হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘ক্রিস্টালাইজেশন’। খাঁটি মধু ঠান্ডায় জমবেই। উলটে মধু তৈরির সময় যদি অতিরিক্ত তাপ ব্যবহার করা হয় বা তাতে প্রচুর ভেজাল মেশানো থাকে, তবে সেই মধু চিরকাল তরলই থেকে যায়, শীতকালেও সহজে জমে না।
মধু কেনার সময় বোতলের লেবেল যাচাই করা সবচেয়ে বেশি জরুরি। নামী ব্র্যান্ডের মধু কিনলে দেখে নিন তাতে এফএসএসএআই (FSSAI) বা আগমার্ক (Agmark)-এর মতো শংসাপত্র রয়েছে কি না। এই চিহ্নগুলি থাকার অর্থ হল, ওই মধু ল্যাবরেটরি টেস্টে পাশ করেছে। একই সঙ্গে প্রস্তুতকারকের নাম এবং মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখও দেখে নেওয়া প্রয়োজন।
মধুর রং বা ঘনত্ব দেখে বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। ফুলের উৎসের উপর নির্ভর করে মধুর রং হালকা থেকে গাঢ় বাদামি হতেই পারে। আবার পাতলা মধু মানেই ভেজাল, আর ঘন মানেই খাঁটি, এই ধারণারও কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তাই রাস্তাঘাটে ‘মৌচাক থেকে সরাসরি ভাঙা’ মধু বলে যা বিক্রি হয়, তা যাচাই না করে কেনা একেবারেই উচিত নয়।
মনে রাখা দরকার, মধুতে প্রাকৃতিকভাবেই গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ থাকে। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্করা দিনে এক থেকে দুই টেবিল চামচ মধু অনায়াসেই খেতে পারেন। তবে ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এক বছরের কম বয়সি শিশুদের কখনওই মধু খাওয়ানো উচিত নয়। কারণ, খাঁটি মধুতেও অনেক সময় বটুলিজম রোগের জীবাণু থাকতে পারে। এই জীবাণু একরত্তি শিশুর শরীরে মারাত্মক বিপদ ডেকে আনতে পারে।