
বাঙালির নস্টালজিয়া আর ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, এই দুয়ের মেলবন্ধন ঘটালে একটা সংলাপ অবধারিতভাবে উঠে আসে। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির ভানুর সেই অমর সংলাপ, “মাসিমা, মালপোয়া খামু!” এই একটা লাইন শুনলেই বাঙালির জিভে আজও জল আসে। তবে পর্দায় এই মালপোয়া খাওয়ার পিছনে একটা দারুণ মজার গল্প লুকিয়ে আছে। মাসিমার কাছে ভানুর মালপোয়া খেতে চাওয়ার আসল কারণ কিন্তু মোটেই মিষ্টিমুখ ছিল না! আসল উদ্দেশ্য ছিল মালপোয়ার অছিলায় গিয়ে রমলা, অর্থাৎ স্বয়ং সুচিত্রা সেনকে চোখের দেখা দেখা! সুচিত্রা সেনের রূপের জাদুতে বুঁদ হয়েই ভানু হয়ে উঠেছিলেন মালপোয়া-পাগল। আর মজার ব্যাপার হল, সুচিত্রা সেনকে দেখার অছিলায় তৈরি হওয়া এই একটি মাত্র দৃশ্যের শুটিং করতে গিয়ে ভানুকে সে দিন পরিচালকের বাড়ি থেকে আসা ২৫টি মালপোয়া গিলতে হয়েছিল! মালপোয়া তো শুধুই মিষ্টি নয়, বাঙালির এক নির্ভেজাল আবেগ। তবে আধুনিক যুগে এসে দেশি মিষ্টির গালভরা ইংরেজি নাম খোঁজার একটা ট্রেন্ড শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, পাতে পড়লে নিমেষে উধাও হয়ে যাওয়া এই মালপোয়াকে ইংরেজিতে ঠিক কী বলে?
ভেবে দেখুন, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় যদি বিলেতে যেতেন, আর সেখানকার কোনও ‘মাসিমা’-কে গিয়ে ইংরেজিতে মালপোয়া খেতে চাইতেন, তাহলে কী বলতেন? গুগলের ট্রান্সলেটর কিংবা সাহেবদের ডিকশনারি ঘাঁটলে মালপোয়ার যে ইংরেজি নামটা উঠে আসে, তা শুনলে ভানুর মালপোয়া খাওয়ার ইচ্ছেটাই হয়তো চিরতরে উবে যেত!
আসলে, মালপোয়াকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘প্যানকেক’ (Pancake)। হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। তবে বিদেশিদের প্যানকেক আর আমাদের মালপোয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাই বিদেশিদের কাছে এর পরিচয় পরিষ্কারভাবে দিতে গেলে বলতে হয় ‘ইন্ডিয়ান সুইট প্যানকেক’ (Indian Sweet Pancake) অথবা ‘ডিপ ফ্রায়েড প্যানকেক ইন সুগার সিরাপ’ (Deep fried pancake in sugar syrup)। মানে, আক্ষরিক অর্থে রসে ডোবানো ভাজা প্যানকেক।
খাঁটি বাঙালির মালপোয়া তৈরি হয় ময়দা, সুজি, দুধ, মৌরি আর ক্ষীরের দারুণ এক মিশ্রণ দিয়ে। তারপর সেটাকে ঘিয়ে বা তেলে কড়া করে ভেজে চিনির রসে চোবানো হয়। এর সঙ্গে সাহেবদের প্যানকেকের তুলনা করলে মালপোয়ার ঘোর অপমানই করা হয় বইকি! সাহেবদের প্যানকেক তো চ্যাপ্টা আর শুকনো, তার ওপরে একটু ম্যাপল সিরাপ ছড়িয়ে ব্রেকফাস্টে খাওয়া হয়। আর আমাদের মালপোয়া রসে টইটম্বুর, মুখে দিলেই যেন স্বর্গের সুখ মেলে। রথযাত্রা হোক বা শীতকালের পিঠেপুলির উৎসব, মালপোয়ার রাজত্বে অন্য কোনও মিষ্টির ভাগ বসানো বেশ কঠিন। মালপোয়া তৈরির এই পদ্ধতি কিন্তু আজকালের নয়। ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বৈদিক যুগেও মালপোয়া খাওয়ার চল ছিল। তখন অবশ্য একে ‘অপূপ’ বলা হত। কালের নিয়মে সেই অপূপই আজ মালপোয়া হয়ে বাঙালির মন জয় করে নিয়েছে।
সব শেষে সেই পুরনো তর্কেই ফিরে আসতে হয়। ভাবুন তো, “আন্টি, আই উইল ইট ডিপ ফ্রায়েড প্যানকেক ইন সুগার সিরাপ” — এই সংলাপ কি কখনও সুচিত্রা সেনকে এক ঝলক দেখার অছিলায় বলা “মাসিমা মালপোয়া খামু”-র মতো আইকনিক হতে পারত? একেবারেই নয়। বরং এই সংলাপ শুনলে ছবির পরিচালক থেকে শুরু করে খোদ ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ও হয়তো অজ্ঞান হয়ে যেতেন। তাই ইংরেজিতে নাম যাই হোক না কেন, বাঙালির কাছে মালপোয়া চিরকাল মালপোয়া-ই থাকবে। এই নামের সঙ্গে একটা আলাদা নস্টালজিয়া জড়িয়ে আছে, যা কোনও দিনও মুছে যাওয়ার নয়। তাই ইংরেজি নামের কচকচিতে না গিয়ে, বরং রসালো আর গরম গরম মালপোয়াতেই মন দেওয়া যাক।