
অফিসে কাজের চাপ সামলানো হোক বা ঘরের খুঁটিনাটি— দিনের শেষে একটু ক্লান্তি আসাটা খুব স্বাভাবিক ঘটনা। অনেকেই ভাবেন, “একটু ঘুমিয়ে নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।” কিন্তু সত্যি কি তাই? যদি এমন হয় যে, পর্যাপ্ত ঘুমের পরেও চোখের পাতা ভার হয়ে আসছে, কিংবা সিঁড়ি দিয়ে কয়েক ধাপ উঠতেই বুক ধড়ফড় করছে? তবে সাবধান! এই সাধারণ ক্লান্তি আসলে শরীরের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বড় কোনও সমস্যার আগাম সঙ্কেত হতে পারে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশের অধিকাংশ নারীই নিজের অজান্তে ‘অ্যানিমিয়া’ বা রক্তাল্পতার শিকার। আর এর মূলে রয়েছে স্রেফ আয়রনের অভাব।
শরীরের প্রধান জ্বালানি হল অক্সিজেন, আর সেই অক্সিজেন বয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব রক্তে থাকা ‘হিমোগ্লোবিন’-এর। এই হিমোগ্লোবিন তৈরির প্রধান উপাদান আয়রন। তাই আয়রনের অভাব হলেই বিপদ।
কেন মহিলারা বেশি ঝুঁকিতে?
মেনস্ট্রুয়াল লস: প্রতি মাসে ঋতুস্রাবের সময় যে পরিমাণ আয়রন শরীর থেকে বেরিয়ে যায়, তা সঠিক ডায়েটের অভাবে পূরণ হয় না।
গর্ভাবস্থার চাহিদা: ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা’ (WHO)-র তথ্য অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় শরীরে আয়রনের চাহিদা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। এই সময় সঠিক সাপ্লিমেন্ট না নিলে ‘লো বার্থ ওয়েট’ বা সময়ের আগে সন্তান প্রসবের (Premature Delivery) ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে।
আয়রন শোষণের অভাব: চা কফি আয়রন শোষণে বাধা দেয়। ‘জার্নাল অফ নিউট্রিশন’-এর তথ্য অনুসারে, খাবারের সঙ্গে চা খেলে শরীর আয়রন শোষণের ক্ষমতা প্রায় ৬০-৭০ শতাংশ হারিয়ে ফেলে।
আপনারও কি রয়েছে আয়রনের ঘাটতি? কীভাবে বুঝবেন?
আয়রনের অভাব হলে শুরুতেই অসুস্থ হবেন না। তবে শরীর ছোট ছোট সংকেত দিতে থাকে।
ফ্যাকাশে চেহারা: আয়নার সামনে দাঁড়ালে যদি ত্বক বা চোখের কোল স্বাভাবিকের চেয়ে ফ্যাকাশে মনে হয় তাহলে সতর্ক হন।
চুল ও নখের দশা: অতিরিক্ত চুল পড়া কিংবা নখ বারবার ভেঙে যাওয়া মোটেও স্বাভাবিক নয়।
মাথাব্যথা ও ঝিমুনি: কাজে মন না বসা, ঘনঘন মাথাব্যথা বা সারাক্ষণ একটা ঝিমুনি ভাব ঘিরে থাকা বিপদ সংকেত।
সরকারি পরিসংখ্যান কী বলছে? (NFHS-5 রিপোর্ট)
ভারতের ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে (NFHS-5)-এর সাম্প্রতিকতম তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে ৫৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১৯ সালের তুলনায় এই হার প্রায় ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, প্রতি দু’জন মহিলার মধ্যে একজনেরও বেশি এই সমস্যায় আক্রান্ত। চিকিৎসকদের মতে, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে আয়রনের অভাব কেবল ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, বরং একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট।
বিজ্ঞান বলছে, নিরামিষ উৎস থেকে পাওয়া আয়রন (Non-heme Iron) শরীর সহজে গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু এর সঙ্গে যখন ভিটামিন-সি (যেমন লেবু বা আমলকী) যোগ করা হয়, তখন শরীর ৩ গুণ বেশি দ্রুত আয়রন শোষণ করতে পারে। এছাড়া লোহার কড়াইয়ে রান্না করার ফলে খাবারের আয়রন গুণমান বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টিও এখন গবেষণায় প্রমাণিত।
সময় থাকতে সতর্ক হতে হবে এবং নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করলে এই সমস্যা থেকে বাঁচতে পারবেন। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।