
অফিস থেকে ফেরার পথে মোবাইলে টুং করে একটা মেসেজ এল— “অভিনন্দন! আপনার জন্য ১০ লক্ষ টাকার লোন রেডি।” ডিনারের টেবিলে বসে ল্যাপটপ খুলতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল নতুন আইফোনের বিজ্ঞাপন— “মাত্র ৩,৯৯৯ টাকার সহজ কিস্তিতে বাড়ি নিয়ে যান।” শুনতে কী ভীষণ সুন্দর, তাই না? কিন্তু এই ‘সহজ’ শব্দটার আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক গভীর সমস্যা, যেখানে আজকের প্রজন্ম নিজের অজান্তেই পা দিচ্ছে। এক সময় লোন নেওয়া মানে ছিল সামাজিক লজ্জা। আর আজ? লোন বা ইএমআই (EMI) যেন স্ট্যাটাস সিম্বল। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ‘ইজি মানি’র নেশায় আজকের যুবপ্রজন্ম তাদের আগামীর উপার্জনকে বর্তমানেই শেষ করে দিচ্ছে।
লোন মানেই যে খারাপ, এমনটা কিন্তু নয়। লোনকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। সোজা ভাষায় বললে— ভালো লোন আর খারাপ লোন।
হোম লোন (কেন এটি ভালো?): বাড়ি কেনা বা ফ্ল্যাট নেওয়াকে বলা হয় ‘অ্যাসেট ‘। সম্পত্তির দাম সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণত বাড়ে। এছাড়া এতে আয়করে ছাড় পাওয়া যায় এবং প্রতি মাসে যে ভাড়ার টাকাটা অন্যের পকেটে যেত, সেটা আপনার নিজের সম্পত্তির জন্য বিনিয়োগ হয়। এটি একটি ‘গুড লোন’।
পার্সোনাল লোন ও ক্রেডিট কার্ড (কেন এড়িয়ে চলবেন?): পুজোর সময় দামী ফোন কেনা, বন্ধুদের সঙ্গে বিদেশে ঘুরতে যাওয়া বা ধুমধাম করে বিয়ের আয়োজন— এই সবের জন্য যখন আপনি লোন নিচ্ছেন, তখন আপনি আসলে টাকার অপচয় করছেন। কারণ, আপনি যে ফোনটি ২ বছরের কিস্তিতে কিনছেন, কিস্তি শেষ হতে হতে সেই ফোনের দাম অর্ধেক হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি সুদ গুনবেন ১২% থেকে ১৮%, এমনকি ২৪% পর্যন্ত। এটি আপনার সম্পদ বাড়ায় না, বরং তিলে তিলে পকেটের সর্বনাশ করে।
কেন ইএমআই আপনার ‘ফিউচার ইনকাম’ শেষ করছে?
হিসেবটা খুব সহজ। আপনার বেতন যদি মাসে ৫০ হাজার টাকা হয় এবং তার মধ্যে ২৫ হাজার টাকা ইএমআই-তে চলে যায়, তবে আপনি আসলে ২৫ হাজার টাকা রোজকার করছেন। বাকি ২৫ হাজার টাকার জন্য আপনি ব্যাঙ্কের হয়ে খাটছেন। অর্থাৎ, আপনার আগামী ২-৩ বছরের ঘাম ঝরানো পরিশ্রমের টাকা ব্যাঙ্কের ভল্টে যাওয়ার জন্য আগে থেকেই বুক হয়ে গিয়েছে। একে বলে ‘আয়ের আগেই ব্যয়’। এই কারণেই বর্তমান প্রজন্মের হাতে জমানো টাকা থাকছে না। কোনও বিপদ এলে তাঁরা আবার নতুন লোন নিচ্ছেন। এভাবে লোনের ফাঁদে পা দিয়ে একের পর এর ঋণের বোঝা চাপাচ্ছেন।
ফাঁদ থেকে মুক্তি পাবেন কীভাবে?
তথ্য বলছে, মধ্যবিত্তের ঋণের জালে জড়ানোর প্রধান কারণ হল ‘ফিয়ার অফ মিসিং আউট’ বা অন্যের দেখাদেখি খরচ করা। এই ফাঁদ থেকে বেরোতে হলে আপনাকে স্মার্ট হতে হবে:
ইচ্ছাপূরণে লোন নয়: মনে রাখবেন, আপনার সামর্থ্য সেই জিনিসটি কেনার তখনই হবে, যখন আপনি সেটি নগদ টাকায় কেনার ক্ষমতা রাখবেন। স্রেফ শখ মেটাতে কিস্তি নেওয়া মানেই আপনি বিপদের মুখে।
জরুরি তহবিল (Emergency Fund): লোন নেওয়ার কথা ভাবার আগে অন্তত ৬ মাসের খরচের সমান টাকা ব্যাঙ্কে জমিয়ে রাখুন। যাতে আপৎকালীন সময়ে নতুন করে ঋণের বোঝা না বাড়ে।
৩০ শতাংশের বেশি নয়: আপনার মাসিক কিস্তি যেন কোনোভাবেই বেতনের ৩০ শতাংশের বেশি না হয়। এর বেশি গেলেই বুঝতে হবে আপনি আর্থিক সংকটের দিকে এগোচ্ছেন।
লোন যেমন আকাশছুঁতে সাহায্য করে,তেমন আবার পায়ের শিকলও হতে পারে। বিজ্ঞাপন দেখে বা অন্যের দেখাদেখি জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর আগে একবার ভাবুন পকেটে টাকা থাকা আর পকেটে লোন থাকা কিন্তু এক কথা নয়।