
রবিবারের খাসির মাংসের ঝোল হোক বা রাস্তার ধারের গরম গরম চপ— আলু ছাড়া বাঙালির পাত একেবারেই ম্যাড়ম্যাড়ে। শুধু আমাদের বাংলা নয়, গোটা বিশ্বেই আলুর তুমুল কদর। কিন্তু কখনও ভেবে দেখেছেন, সবার প্রিয় এই আলুর জন্ম ঠিক কীভাবে হল? এতদিন এই ইতিহাস একটা বড় রহস্য ছিল। তবে সম্প্রতি বিজ্ঞান পত্রিকা ‘সেল’-এ প্রকাশিত এক গবেষণা এই রহস্যের পর্দা ফাঁস করেছে। আর তাতেই বেরিয়ে এসেছে এক চমকে দেওয়া তথ্য। আজকের এই আলুর জন্মের পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান নাকি টোম্যাটোর!
কী বলছে গবেষণা?
চিনা অ্যাকাডেমি অফ এগ্রিকালচারাল সায়েন্সের বিজ্ঞানীরা আলুর নাড়িনক্ষত্র খুঁজতে গিয়ে প্রায় ৫০০-র বেশি বুনো ও চাষের আলুর ডিএনএ পরীক্ষা করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, আলু এবং টোম্যাটো আসলে একই পরিবারের সদস্য। আজ থেকে প্রায় দেড় কোটি বছর আগে এদের পূর্বপুরুষ একই ছিল। সময়ের নিয়মে একটা সময় তারা আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু আসল ম্যাজিকটা ঘটে আরও প্রায় ৫০ লক্ষ বছর পর। প্রকৃতির খেয়ালেই একটি বুনো টোম্যাটো এবং আলুর এক প্রাচীন বুনো জাতভাইয়ের মধ্যে মিলন ঘটে।
এবার আসা যাক সেই জাদুতে! টোম্যাটোর আমরা ফল খাই, আর মাটির নীচে থাকে আলু। কিন্তু আলুর ওই প্রাচীন জাতভাইয়ের মাটির নীচে কাণ্ড থাকলেও তাতে গোলগাল কোনও আলু ফলত না! তা হলে আলু এল কোথা থেকে? বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এই দুই গাছের মিলনের ফলে জিনের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন আসে। ‘StSP6A’ নামের একটি বিশেষ জিনের জাদুতে গাছের যাবতীয় শক্তি বা শর্করা মাটির নীচের কাণ্ডে জমতে শুরু করে। আর সেটাই ক্রমশ ফুলে ফেঁপে আজকের আলুর আকার নেয়।
কিন্তু কেন এই পরিবর্তন জরুরি ছিল?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালার রুক্ষ ও প্রতিকূল পরিবেশে। লক্ষ লক্ষ বছর আগে সেখানকার হাড়কাঁপানো ঠান্ডা এবং শুষ্ক আবহাওয়ায় মাটির উপরে টিকে থাকা উদ্ভিদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছিল। তাই প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করতেই এই অভিনব অভিযোজন। মাটির নীচে পুষ্টি সঞ্চয় করে রাখা এবং বীজ ছাড়াই অযৌন জননের মাধ্যমে বংশবৃদ্ধির তাগিদেই জন্ম নেয় আজকের এই কন্দজাতীয় আলু।
বাঙালির হেঁশেলে এই আলুর প্রবেশ হল কীভাবে?
আলুর জন্মের গল্প তো জানলেন, কিন্তু আমাদের ভারতে, বিশেষ করে বাঙালির হেঁশেলে এই আলুর প্রবেশ হল কীভাবে? ইতিহাস বলছে, আজ থেকে প্রায় চারশো বছর আগে পর্তুগিজ নাবিকদের হাত ধরেই ভারতে প্রথম আলু এসেছিল। মাসের পর মাস সমুদ্রযাত্রায় পেট ভরাতে সহজে না-পচা আলুই ছিল তাদের প্রধান ভরসা। এরপর ব্রিটিশ আমলে বাংলার প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস সস্তায় ফলিয়ে ইউরোপে বিক্রির আশায় ভারতে আলুর ব্যাপক চাষ শুরু করেন। উত্তরাখণ্ডের পাহাড়ি এলাকা নৈনিতাল, মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জি হয়ে ধীরে ধীরে তা ছড়িয়ে পড়ে গোটা দেশে। এরপর কলকাতার আশেপাশে ইংরেজরা আলুর চাষ শুরু করতেই কেল্লাফতে! বাঙালির পাতে সেই যে আলু পাকাপাকি ভাবে জায়গা করে নিল, আজও তার রাজত্ব সমান দাপটের সঙ্গে চলছে।