
বাঙালির কালীপুজো আর শ্যামাপোকা যেন এক মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। প্রদীপের আলো হোক বা বাড়ির বাইরের টিউবলাইট, এই খুদে পোকাদের দাপাদাপি একসময় ছিল উৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ! সবচেয়ে বেশি বিরক্তি ধরত যখন এরা দলবেঁধে চোখে, কানে বা নাকের ভেতর ঢুকে পড়ত। সেই জ্বালায় রীতিমতো অতিষ্ঠ হতে হত সবাইকে। কিন্তু গত কয়েক বছরে ছবিটা একেবারে বদলে গিয়েছে। আলোর চারপাশে এখন আর সেই চেনা ভিড় নেই। এরা পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি, শুধু আগের চেয়ে অনেক কম দেখা যায়। বলা যায়, এরা এখন একটু লুকোচুরি খেলছে। খুঁজলে দু-একটার দেখা ঠিকই মেলে। কিন্তু প্রশ্ন হল, দলে দলে এসে একসময় জ্বালিয়ে অতিষ্ঠ করা এই পোকারা কেন হঠাৎ এমন ‘ভিআইপি’ হয়ে উঠল? পতঙ্গবিদ এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।
প্রথমত, আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা। জ্যুলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া (ZSI)-এর বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, শ্যামাপোকারা একটু শীতকাতুরে স্বভাবের। আগে কালীপুজোর সময় বাতাসে একটা শিরশিরে ঠান্ডা ভাব থাকত। ওই হালকা শীতের আমেজটা এদের বংশবৃদ্ধির জন্য একদম উপযুক্ত। কিন্তু এখন তো নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত ফ্যান চালাতে হয়! প্রকৃতির এই ভোলবদল দেখে শ্যামাপোকারাও হয়তো রীতিমতো দ্বিধায় পড়ে গিয়েছে। এরা বুঝতেই পারছে না, এটা কালীপুজোর সময় না চৈত্র মাস! ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই প্রজননে মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, কৃষিকাজে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার। বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (BCKV) বিশেষজ্ঞদের মতে, পোকাদের আসল বাড়ি হল কৃষিজমি, বিশেষ করে ধানখেত। কিন্তু ফলন বাড়াতে গিয়ে এখন জমিতে প্রচুর রাসায়নিক সার আর কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। সেই কড়া ওষুধের দাপটে বেচারা শ্যামাপোকাদের এমনিতেই প্রাণ ওষ্ঠাগত। গ্রামের দিকের জমিতেই যখন এদের টিকে থাকা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন শহরের কংক্রিটের জঙ্গলে এদের দেখা পাওয়া তো রীতিমতো লটারির টিকিট জেতার মতো ব্যাপার!
তৃতীয়ত, আলোর ধরন বদল। শ্যামাপোকা আসলে একটু ‘রোমান্টিক’ প্রকৃতির। মাটির প্রদীপ বা পুরনো আমলের হলদেটে বাল্বের স্নিগ্ধ আলো এদের খুব পছন্দ ছিল। কিন্তু এখন চারদিকে চোখ-ধাঁধানো এলইডি আর ফ্লাডলাইটের রমরমা। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন, এত কড়া আলোতে খুদে পোকাদের সেন্সর নষ্ট হয়ে একেবারে দিশেহারা অবস্থা হয়। তীব্র আলো সহ্য করতে না পেরে অনেকেই দিকভ্রষ্ট হয়ে যায়।
সব মিলিয়ে, শ্যামাপোকা পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়নি। চোখে-মুখে ঢুকে আগের মতো জ্বালাতনও হয়তো করছে না। এরা আছে, তবে পরিবেশ দূষণ এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে না পেরে একটু আড়ালে আবডালেই থাকছে। প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়ম বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের শিকার হয়েই আগের চেয়ে অনেক কম দেখা যাচ্ছে একসময়ের উৎসবের চেনা সঙ্গীকে।