
ছোটবেলায় আমাদের অনেকেরই মা-ঠাকুমার বলতেন, ‘সাপ বলো না… লতা বলো।’ আমরা প্রশ্নও করতাম ‘কেন?’ তার একাধিক ব্যাখ্যাও দিতেন, তার মধ্যে একটা- ‘রাতের বেলায় সাপ বললে নাকি সাপ চলে আসে…!’ বড় হওয়ার পর আমরা আনমনে এসব কথা ভেবে হয়তো হাসি, আজকালকার জেনারেশনের বাবা-মা তাঁদের সন্তানদের হয়তো এখন এমনটা আর বলেন না। কিংবা গ্রাম বাংলার দিকে হয়তো এখনও বলেন। কিন্তু জানেন কি কেন সাপকে লতা বলা হয়?
নাহ! আলাদা করে কোনও কারণ নেই। সাপকে ‘লতা’ বলার পেছনে মূলত গ্রামীণ লোকবিশ্বাস এবং সাপের শারীরিক গঠন।
শারীরিক সাদৃশ্য: সাপের শরীর লম্বা, সরু এবং অত্যন্ত নমনীয়। গাছের লতা যেমন এঁকেবেঁকে বাড়ে বা কোনো কিছুকে পেঁচিয়ে ধরে, সাপও ঠিক তেমনি মাটিতে এঁকেবেঁকে চলে বা গাছের ডালে পেঁচিয়ে ওঠে। চলন ও গঠনের এই দৃশ্যগত মিলের কারণেই সাপকে লতার সাথে তুলনা করা হয়।
কুসংস্কার ও সতর্কতা: গ্রামবাংলায় একটি পুরনো লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, রাতের বেলা সাপের আসল নাম (অর্থাৎ ‘সাপ’) উচ্চারণ করলে তা ঘরে চলে আসতে পারে বা অমঙ্গল হতে পারে। রাতের অন্ধকারে সাপকে বোঝাতে মানুষ তাই এর আসল নাম এড়িয়ে সাংকেতিক বা রূপক শব্দ ব্যবহার করত। সাপের পরিবর্তে ‘লতা’, ‘দড়ি’ বা ‘পোকা’ বলাটা মূলত সেই ভয় ও সতর্কতারই অংশ।
মূলত রাতের বেলা সাপের নাম এড়িয়ে যাওয়া এবং এর লতানো চলনের কারণেই লোকমুখে এই শব্দটির প্রচলন হয়েছে। রাতের বেলা সাপের আসল নাম উচ্চারণ করতে বারণ করার পেছনে মূলত প্রাচীন লোকবিশ্বাস, অন্ধকারের ভয় এবং গ্রামীণ মানুষের মনস্তত্ত্ব জড়িয়ে আছে।
নাম ধরে ডাকার কুসংস্কার: প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের মধ্যে একটি বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে, রাতের অন্ধকারে কোনও ক্ষতিকর প্রাণী বা অশুভ শক্তির আসল নাম ধরে ডাকলে তারা আকৃষ্ট হয় এবং গৃহস্থের বাড়িতে চলে আসে। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘নেম ট্যাবু’ বা নাম-নিষেধাজ্ঞা বলা হয়। এই ভয় থেকেই সাপের নাম মুখে আনা হতো না।
অন্ধকারের আতঙ্ক ও মনস্তত্ত্ব: আগেকার দিনে গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে সাপের ভয় ছিল নিত্যদিনের একটি বাস্তব বিপদ। অন্ধকারে ‘সাপ’ শব্দটি উচ্চারণ করলেই মানুষের মনে, বিশেষ করে শিশুদের মনে চরম আতঙ্ক তৈরি হতো। সাপের বদলে ‘লতা’ বা ‘দড়ি’ বললে বাড়ির লোকেরা বিপদের ইঙ্গিত পেয়ে সতর্ক ঠিকই হতো, কিন্তু হঠাৎ করে আতঙ্কিত হয়ে ছুটোছুটি করত না।
সাপের নিশাচর স্বভাব: অনেক প্রজাতির সাপ রাতের বেলা শিকারের খোঁজে বা শীতল পরিবেশে চলাফেরা করতে বের হয়। তাই রাতেই তাদের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকত। এই বাস্তব বিপদের ভয় থেকেই সূর্যাস্তের পর নাম নেওয়ার বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা তৈরি হয়েছিল।
ধর্মীয় বিশ্বাস ও ভক্তি: গ্রামবাংলায় সাপকে দেবী মনসার প্রতীক হিসেবে পুজো করা হয়। রাতের বেলা অকারণে সাপের নাম নেওয়াকে অনেকেই অমঙ্গলজনক বা দেবীর রোষের কারণ হতে পারে বলে মনে করতেন।
অর্থাৎ, বাস্তবের বিপদ থেকে বাঁচার জন্য মানুষের অবচেতন মনের ভয় এবং বিপদ এড়ানোর কৌশল থেকেই রাতে ‘সাপ’ না বলে ‘লতা’ বলার এই নিয়মের জন্ম হয়েছিল। এর পেছনে কোনও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, এটি সম্পূর্ণই লোকজ সংস্কৃতির অংশ।