
রাতের অন্ধকারে বাথরুম বা রান্নাঘরের লাইট জ্বালাতেই আরশোলা দেখে অনেকেরই রীতিমতো ভিরমি খাওয়ার জোগাড় হয়! জুতো পেটা খাওয়ার পরও এরা যে স্পিডে দৌড় লাগায়, তা দেখে হার মানবেন উসেইন বোল্টও। তবে এই পরম শত্রুর এমন এক অদ্ভুত শারীরিক ক্ষমতা রয়েছে, যা শুনলে রীতিমতো তাজ্জব বনে যেতে হবে।
শুনলে অবাক লাগতে পারে, কিন্তু একটি আরশোলার মাথা কেটে ফেলার পরও সেটি অন্তত এক সপ্তাহ দিব্যি বেঁচে থাকতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে মাথা বা মস্তিষ্ক ছাড়া এক মুহূর্ত বেঁচে থাকার কথা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু এই পতঙ্গের শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে কাজ করে, যা সত্যিই বিজ্ঞানের এক বড় বিস্ময়।
আসলে শ্বাস নেওয়ার জন্য এরা কখনও নিজেদের মুখ বা নাকের ওপর নির্ভর করে না। এদের শরীরের দু’পাশে সারি সারি ছোট ছোট ছিদ্র থাকে, যাদের বিজ্ঞানের ভাষায় স্পিরাকল বলা হয়। এই বিশেষ ছিদ্রগুলোর মাধ্যমেই বাতাস সরাসরি শরীরের একেবারে কোণায় কোণায় পৌঁছে যায়।
যেহেতু শ্বাস নেওয়ার কাজে মাথার কোনও ভূমিকা নেই, তাই মাথা কাটার পরও এদের শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিকভাবেই চলতে থাকে। শরীরের ওই স্পিরাকল দিয়ে বাতাস যাতায়াত করতে কোনও সমস্যাই হয় না। ফলে স্রেফ শ্বাসরোধ হয়ে এই পতঙ্গের মৃত্যুর কোনও সম্ভাবনাই থাকে না।
এদের রক্ত সংবহনতন্ত্রও মানুষের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, যা মূলত একটি মুক্ত সংবহনতন্ত্র হিসেবে কাজ করে। মানুষের মতো এদের শরীরে উচ্চ চাপে রক্ত চলাচল করে না, তাই মাথা কাটা গেলেও ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটে বেরোয় না। বরং কাটা জায়গায় খুব দ্রুত রক্ত জমাট বেঁধে যায় এবং প্রাণহানি রুখে দেয়।
মজার বিষয় হল, আরশোলার স্নায়ুতন্ত্র কেবল মস্তিষ্কের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং সারা শরীরে গ্যাংলিয়া নামক স্নায়ুকোষের গুচ্ছ ছড়িয়ে থাকে। এই স্নায়ুকেন্দ্রগুলো শরীরের প্রাথমিক নড়াচড়া ও অনুভূতি স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে দারুণভাবে সক্ষম। তাই মাথা ছাড়াই এরা দিব্যি হাঁটাচলা করতে পারে এবং বাইরের স্পর্শের সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দিতে পারে।
মাথা কাটা যাওয়ার পর এরা দিব্যি ঘুরে বেড়াতে পারলেও, মুশকিল হয় অন্য জায়গায়। যেহেতু এদের আর কোনও মুখ থাকে না, তাই খাবার বা জল খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরা শীতল রক্তের প্রাণী হওয়ায় না খেয়ে দীর্ঘদিন কাটাতে পারলেও, শেষ পর্যন্ত জলের অভাবেই এদের মৃত্যু হয়।
শুনলে আরও অবাক হবেন, এরা জলের নিচেও প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট পর্যন্ত দিব্যি নিশ্বাস আটকে রাখতে পারে। অনুকূল আবহাওয়া ও ঠান্ডা পরিবেশ পেলে এরা আরও বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকার ক্ষমতা রাখে। অনেকের কাছে বিরক্তিকর পতঙ্গটির এমন অবাক করা বেঁচে থাকার পদ্ধতি প্রমাণ করে, প্রকৃতির খেলায় এরা সত্যিই এক অনন্য সৃষ্টি।