
অন্ধকার সিনেমা হল, পর্দায় তাঁর এন্ট্রি আর সিটে বসা দর্শকের মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যাওয়া এক অদ্ভুত ঠান্ডা স্রোত। বিদেশে গিয়ে নায়িকার সঙ্গে রোম্যান্স করা হিরো তিনি নন, তথাকথিত চকোলেট বয় ইমেজও তাঁর নেই। তিনি যেন এক জ্বলন্ত আগুন, যাঁর সিক্স প্যাক অ্যাবস ছাড়াই পর্দায় রাজত্ব করেছেন তিনি।
তাঁর অস্ত্র বলতে কেবল দুটো, ধারালো স্বর আর চোখের তীক্ষ্ণ চাহনি। এই দুইয়ের জোরেই বলিউডের চেনা হিসেবনিকেশ পুরোপুরি বদলে দিয়েছিলেন নানা পাটেকর। তাঁর অভিনীত চরিত্র আর আগুনঝরা সংলাপ দর্শকের মনের মণিকোঠায় আজীবন থেকে যাবে।
নানা পাটেকর মানেই রাগী, জেদি এবং পচে যাওয়া সিস্টেমের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো এক প্রতিবাদী মুখ। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া 'ক্রান্তিবীর' সিনেমায় ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই বিখ্যাত চিৎকার আজও গায়ে কাঁটা দেয়। মৃত্যুর ঠিক আগে তাঁর বলা "আ গয়ে মেরি মউত কা তামাশা দেখনে!" ঘুমিয়ে থাকা সমাজকে সজাগ করে দিয়েছিল।
ওই সিনেমাতেই হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা রুখতে নিজের হাত কেটে তিনি এক অসামান্য বার্তা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "ইয়ে হিন্দু কা খুন হ্যায়, ইয়ে মুসলমান কা খুন হ্যায়, বাতা ইসমে সে হিন্দু কা কউনসা হ্যায় অওর মুসলমান কা কউনসা!" ধর্মীয় বিভেদের বিরুদ্ধে এমন সংলাপ বলিউড আগে কখনও শোনেনি।
এরপর ১৯৯৭ সালের 'যশবন্ত' সিনেমায় তাঁর বলা সেই অমর সংলাপ তো রীতিমতো ইতিহাস তৈরি করেছিল। তাঁর সেই তীব্র হুঙ্কার ছিল, "এক মচ্ছর সালা আদমি কো হিজড়া বানা দেতা হ্যায়!" সমাজের দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের হাড়হিম করা অসহায়তা বোঝাতে আজও এই লাইনটির চেয়ে বড় কোনও উদাহরণ নেই।
নানার কথা উঠবে আর 'তিরঙ্গা' সিনেমার কথা মনে পড়বে না, তা কি কখনও হয়! রাজকুমারের মতো ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চেনা মেজাজে তিনি বলেছিলেন, "মেরা ভি এক উসুল হ্যায় ওয়াঘলে, পহেলে মুলাকাত, ফির বাত, অউর ফির লাত।" ওই একই সিনেমায় দুর্নীতিগ্রস্ত সিস্টেমের বিরুদ্ধে তাঁর বলা, "সচ্চে পুলিশ কি ইয়া তো মউত হোতি হ্যায়... ইয়া তো সাসপেন্ড কিয়া জাতা হ্যায়" আজও জনপ্রিয়।
শুধু ইতিবাচক চরিত্রই নয়, ১৯৮৯ সালের বিধু বিনোদ চোপড়ার 'পরিন্দা' সিনেমায় গ্যাংস্টার আন্নার চরিত্রে তাঁর ভিলেন রূপ গোটা দেশকে চমকে দিয়েছিল। তাঁর সেই হাড়হিম করা সংলাপ ছিল, "ধন্দে মে কোই কিসি কা ভাই নেহি হোতা, ধন্দা ধন্দা হোতা হ্যায়"। আন্ডারওয়ার্ল্ড সিনেমার ইতিহাসে তাঁর এই সংলাপ আজও এক অন্যতম মাইলফলক হয়ে রয়ে গিয়েছে।
রাগী চরিত্রের বাইরে ২০০৭ সালের 'ওয়েলকাম' সিনেমায় ডন উদয় শেট্টির চরিত্রে তাঁর বলা, "কন্ট্রোল উদয়, কন্ট্রোল!" আজকের সোশাল মিডিয়ার সবচেয়ে বড় মিম ট্রেন্ড। প্রথাগত গ্ল্যামারাস হিরো না হয়েও তিনি প্রমাণ করেছেন, পর্দায় ম্যাজিক তৈরি করতে খাঁটি অভিনয়ের আগুন লাগে। তথাকথিত অভিনেতারা হয়তো সময়ের নিয়মে হারিয়ে যাবেন, কিন্তু নানা পাটেকরের এই আইকনিক সংলাপগুলি ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসে চিরকাল অমর হয়ে থাকবে।