
শিউলি ঝরা ভোরে বেজে উঠেছে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই অমর কণ্ঠস্বর—“যা দেবী সর্বভূতেষু…” আর এর সঙ্গেই শুরু হয়ে গেছে বাঙালির সর্বশ্রেষ্ঠ দুর্গোৎসবের কাউন্টডাউন। আগামীকাল অর্থাৎ ১০ অক্টোবর, শনিবার মহালয়া। সনাতন ধর্মে মহালয়ার দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। কথিত আছে, এই বিশেষ দিনে প্রয়াত পূর্বপুরুষেরা তাঁদের বর্তমান বংশধরদের হাতের জল ও তিল গ্রহণ করতে মর্ত্যে নেমে আসেন। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে এই দিন থেকেই যেমন দেবীপক্ষের শুভ সূচনা হয়, তেমনই গঙ্গার ঘাটে ঘাটে চলে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ ও পিণ্ডদান।
পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, প্রতিটি মানুষের জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর ওপর তিনটি প্রধান ঋণ বা দায়বদ্ধতা জন্ম নেয়। এগুলি হল—পিতৃঋণ, দেবঋণ এবং ঋষিঋণ। এর মধ্যে ‘পিতৃঋণ’ বা পূর্বপুরুষদের প্রতি দায়বদ্ধতাকে সবার উপরে স্থান দেওয়া হয়েছে। এই পিতৃঋণ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্যই মহালয়ার দিন তর্পণ করা অত্যন্ত জরুরি। হিন্দুশাস্ত্র মতে, বংশধরদের হাতের জল ও তিল পেয়ে পূর্বপুরুষদের আত্মা তৃপ্ত হয় এবং তাঁরা আশীর্বাদ করেন।
তর্পণের অধিকার কি শুধু পুত্রসন্তানদেরই?
সাধারণত সমাজে বহুকাল ধরে এ কথাই প্রচলিত রয়েছে যে পুত্রসন্তানেরাই কেবল তর্পণ বা পিণ্ডদান করতে পারেন। কিন্তু শাস্ত্র ঘেঁটে দেখলে এর সম্পূর্ণ অন্য এক রূপ ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়। ধর্মীয় গবেষকদের একাংশের মতে, মহিলারা তর্পণ করতে পারবেন না—এমন কোনও কঠোর বা নির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা কোনও শাস্ত্রে লেখা নেই। বরং প্রয়াত পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর অধিকার সকলেরই রয়েছে।
যে পরিবারে কোনও পুত্রসন্তান নেই, সে ক্ষেত্রে কন্যাসন্তানেরাও সসম্মানে তর্পণ করতে পারেন। এমনকি পুত্র বা কন্যা না থাকলে পুত্রবধূরাও জলদান করতে পারেন। মৃত ব্যক্তির সঙ্গে রক্ত বা আত্মিক সম্পর্কের যে কোনও ব্যক্তিমাত্রই তর্পণের অধিকারী। এমন কি কোনও অবিবাহিত ব্যক্তির অকালপ্রয়াণ ঘটলে তাঁর বোন বা নিকটাত্মীয়রাও তাঁর উদ্দেশে তর্পণ করতে পারেন। পূর্বপুরুষদের সম্মান জানানো মানে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, আর এই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদ বা কোনও সামাজিক সংস্কারের বাধা শাস্ত্র অনুমোদন করে না।
বিশেষ করে পরাশর সংহিতা, যা হিন্দু ধর্মের অন্যতম প্রামাণ্য ধর্মশাস্ত্র ও উপপুরাণতুল্য গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত, তাতে নারীদের তর্পণের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। পরাশর ঋষি তাঁর শাস্ত্রে উল্লেখ করেছেন যে মৃত ব্যক্তির পরিবারে যদি কোনও পুরুষ সদস্য না থাকে, কিংবা তাঁরা যদি অক্ষম হন, তবে সেই পরিবারের কন্যারা, পুত্রবধূরা বা স্ত্রী তর্পণ ও পিণ্ডদান করতে পারেন।
এছাড়াও, বিভিন্ন পৌরাণিক আখ্যান এবং ধর্মীয় গ্রন্থ যেমন গরুড় পুরাণ (Garuda Purana) এবং অগ্নি পুরাণ (Agni Purana)-এর শ্রাদ্ধকাণ্ড ও পিতৃপক্ষ সংক্রান্ত অধ্যায়গুলিতেও পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তি কামনায় পরিবারের যে কোনও রক্তসম্পর্কিত বা দায়দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যের তর্পণ করার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। শাস্ত্রের মূল বক্তব্য হলো, তর্পণের মূল উদ্দেশ্য হল আত্মিক তৃপ্তি এবং পূর্বপুরুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ; আর এই পবিত্র কাজের ক্ষেত্রে কোনও লিঙ্গভেদ বা সামাজিক বিধিনিষেধের স্থান নেই।