
ভোরবেলা গঙ্গার ঘাট। চারদিক একেবারে শুনশান। হঠাৎই কানে এল রিনিঝিনি নূপুরের শব্দ! লোকমুখে প্রচলিত, সাদা শাড়ি পরা, গায়ে গামছা জড়ানো এক অপূর্ব সুন্দরী নারী নাকি কাঁখে কলসী নিয়ে গঙ্গার দিকে হেঁটে যান। কে তিনি? কান পাতলে শোনা যায়, তিনি স্বয়ং মা দুর্গা (Maa Durga)! শুনতে অবাক লাগলেও, উত্তর কলকাতার বুকে আজও ঘুরে বেড়ায় এমনই সব অলৌকিক গল্প। আর এই আশ্চর্য জনশ্রুতির কেন্দ্রে রয়েছে হেদুয়া পার্কের কাছে অবস্থিত শ্রী শ্রী জগৎজননীর মন্দির। ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে যেখানে পূজিতা হয়ে আসছেন সাহা পরিবারের কুলদেবী শ্রীশ্রী জগজ্জননী।
এই গল্পের শুরুটা আজ থেকে ১৫০ বছরেরও বেশি আগে। সালটা ১৮৭২, অর্থাৎ ১২৭৮ বঙ্গাব্দ। সিপাহী বিদ্রোহের আগুনে তখন পুড়ছে গোটা দেশ। সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে মিরাট ছেড়ে কলকাতায় চলে আসতে বাধ্য হন ব্যবসায়ী গুরুপ্রসাদ সাহা। তিনি তখন সৈন্যদের খাবার সরবরাহের কাজ করতেন। কলকাতায় এসে প্রচুর ধনসম্পত্তি, নাম-যশ সব পেলেন ঠিকই, কিন্তু মনের শান্তি যেন একেবারে উধাও!
মিরাটের মন্দিরে তাঁদের পূর্বপুরুষরা মহা সমারোহে মা জগজ্জননীর আরাধনা করতেন। শেষমেশ দেবীর অনুমতি নিয়েই গুরুপ্রসাদের দুই ছেলে, জনার্দন ও মুকুন্দমুরারী সাহা কলকাতার বুকে উত্তর ভারতের আদলে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। যা আজ লোকমুখে ‘মানিকতলার সোনার দুর্গাবাড়ি’ নামেও পরিচিত।
মন্দিরের সুবিশাল দালানে পা রাখলেই চোখ জুড়িয়ে যাবে। সেখানে বিরাজ করছেন দেড় থেকে দুই ফুটের অষ্টধাতুর দেবীপ্রতিমা। দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনীর সব অস্ত্র নাকি খাঁটি সোনার তৈরি! তবে মায়ের বাহন সিংহটি এখানে ঠিক ঘোড়ার মতো দেখতে। একচালা প্রতিমায় মায়ের সঙ্গে রয়েছেন লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। পাশেই রুপোর সিংহাসনে অধিষ্ঠিত নারায়ণ। দেবীকে নিত্যপুজোয় ফল, মিষ্টি, লুচি ও দুধ ভোগ দেওয়া হয়। তবে মাকে কখনও রসের মিষ্টি দেওয়া হয় না, দেওয়া হয় সন্দেশ। বিশেষ দিনে নিষ্ঠাভরে সাজানো হয় বাইশ বারকোশ নৈবেদ্য।
সবচেয়ে মজার বিষয় হল, এই সাহা বাড়িতে শারদীয়া দুর্গাপুজোর খুব একটা চল নেই। বদলে চৈত্র মাসে বিশাল আড়ম্বরে পালিত হয় বাসন্তী পুজো। ষষ্ঠী থেকে দশমী, এই চারদিন মা রাজবেশে সাজেন। অষ্টমীতে ধুনো পোড়ানো এবং দোলের মতো ‘চাঁচর’ পোড়ানোর প্রাচীন রীতি আজও টিকে রয়েছে এখানে। শুনলে অবাক হবেন, এই পুজোয় আজও ৬ মণ চালের নৈবেদ্য দেওয়া হয়! দশমীতে সধবাদের কনকাঞ্জলি এবং সিঁদুর খেলার মধ্যে দিয়ে পুজো শেষ হয়। মাঘী পূর্ণিমার পরের সংক্রান্তিতে পালিত হয় ‘জগজ্জননী জন্মযাত্রা’, যা এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠার দিন হিসেবে ধরা হয়।
কীভাবে যাবেন এবং দর্শনের সময়?
ঠিকানা: ৭৭ নম্বর মানিকতলা স্ট্রিট (শিশির ভাদুড়ী সরণি)। বাসে করে গেলে নামতে হবে চালতাবাগান পেট্রোল পাম্পে। পেট্রোল পাম্পের ঠিক উল্টো দিকের গলি ধরে একটু এগোলেই চোখে পড়বে গোলাপি রঙের জগৎজননীর মন্দির।
সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মন্দির খোলা থাকে। প্রতিদিন বিকেল ৬টার পর হয় সন্ধ্যারতি। আর সকাল ৯টায় হয় মায়ের নিত্যপুজো। অলৌকিক জনশ্রুতি আর ইতিহাসের সাক্ষী হতে সময় করে একবার ঘুরে আসতেই পারেন রূপকথার মতো এই মন্দির থেকে।