পাতাল ফুঁড়ে জেগেছেন দেবাদিদেব! দিঘার একদম পাশে এই মন্দিরের কাহিনি গায়ে কাঁটা দেবে…

এখানে মহাদেবের কোনও মূর্তির দেখা মিলবে না। পাতাল ফুঁড়ে উঠে আসায় এখানে শিব ‘স্বয়ম্ভূ’। চন্দন গাছের গোড়ায় প্রথম দেখা মিলেছিল বলে নাম হয়েছে ‘চন্দনেশ্বর মন্দির’। প্রাঙ্গণে থাকা প্রাচীন ‘কল্পবৃক্ষ’-এ আজও হাজারো সুতো ঘোরে ভক্তদের মনস্কামনা নিয়ে। নিঃসন্তান দম্পতি থেকে শুরু করে দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত মানুষ— চন্দনেশ্বরের দুয়ার থেকে কেউ খালি হাতে ফেরেন না বলেই দাবি স্থানীয়দের।

পাতাল ফুঁড়ে জেগেছেন দেবাদিদেব! দিঘার একদম পাশে এই মন্দিরের কাহিনি গায়ে কাঁটা দেবে...
চন্দনেশ্বর মন্দির

Apr 13, 2026 | 2:36 PM

ভাবুন তো, কয়েক হাজার মানুষের ভিড়। মাঝখানে জলভরা এক পুকুর। আর সেখান থেকেই আচমকা ভেসে উঠল তিন-তিনটে কাঠ! গল্পের শুরুটা এখানেই নয়। আসল শিহরণ জাগে তখন, যখন প্রধান সন্ন্যাসী একটি কাঠে সিঁদুর লেপে মন্ত্রোচ্চারণ করেন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে সবার চোখের সামনে থেকে ভোজবাজির মতো বেমালুম উধাও হয়ে যায় সেই কাঠ! কোনও ম্যাজিক নয়, ওড়িশার বালেশ্বর জেলার প্রাচীন চন্দনেশ্বর শিব মন্দিরে বছরের পর বছর ধরে চড়কের দিন ঘটে চলেছে এই ঘটনা। যেখানে আধুনিক বিজ্ঞান হার মেনেছে অমোঘ বিশ্বাসের কাছে।

চন্দনেশ্বর মন্দিরের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে এক ব্রাত্য গৃহবধূর চোখের জল আর ভক্তির গল্প। কথিত আছে, পাঁচশো বছর আগে এই চত্বর ছিল গভীর হোগলা বন আর কাজু গাছের জঙ্গল। তেলি ঘরের মেজো বউ লক্ষ্মী যখন গরু চরাতে যেতেন, তাঁর কপালে জুটত শুধুই লাঞ্ছনা। গরু দুধ দিচ্ছে না— এই ‘অপরাধে’ পরিবার থেকে বিতাড়িত করা হয়েছিল তাঁকে।

সেই ঘরছাড়া লক্ষ্মীই একদিন বনের গভীরে দেখতে পান এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য। তাঁর গরুটি একটি চম্পক গাছের তলায় দাঁড়িয়ে নিজে থেকেই দুধ ঢালছে মাটির ওপর। আর সেখান থেকেই উঁকি দিচ্ছে এক শিবলিঙ্গ। আকাশ থেকে আপনিই ঝরে পড়ছে ফুল আর বেলপাতা। আর পুজো মিটলেই সেই লিঙ্গ ফের মিলিয়ে যাচ্ছে পাতালের গভীরে। সেই অভাগী লক্ষ্মীর হাত ধরেই জঙ্গল কেটে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল আজকের এই জাগ্রত মন্দিরের। আজও তাই ঘরছাড়া অসহায় মহিলারা সংসার ফিরে পেতে এখানে এসে ‘হত্যে’ দিয়ে পড়ে থাকেন।

এখানে মহাদেবের কোনও মূর্তির দেখা মিলবে না। পাতাল ফুঁড়ে উঠে আসায় এখানে শিব ‘স্বয়ম্ভূ’। চন্দন গাছের গোড়ায় প্রথম দেখা মিলেছিল বলে নাম হয়েছে ‘চন্দনেশ্বর মন্দির’। প্রাঙ্গণে থাকা প্রাচীন ‘কল্পবৃক্ষ’-এ আজও হাজারো সুতো ঘোরে ভক্তদের মনস্কামনা নিয়ে। নিঃসন্তান দম্পতি থেকে শুরু করে দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত মানুষ— চন্দনেশ্বরের দুয়ার থেকে কেউ খালি হাতে ফেরেন না বলেই দাবি স্থানীয়দের।

এই মন্দিরের উৎসব মানেই যেন এক আদিম শক্তির আরাধনা। বিশেষ করে চড়ক মেলা চলাকালীন যে ‘পাঠ পর্ব’ অনুষ্ঠিত হয়, তার বর্ণনা শুনলে আজও মানুষের গায়ের লোম খাড়া হয়ে যায়। চড়ক মেলা উপলক্ষে চন্দনেশ্বরে এখন তিল ধারণের জায়গা নেই। ১৩ দিনের এই মেলায় শেষ লগ্নে এসে ভক্তদের উন্মাদনা যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ে। বহু ভক্ত টানা উপবাস থেকে ‘কল্পবৃক্ষ’-এ সুতো বেঁধে প্রার্থনা করেন। চড়কের দিন থেকে শুরু হয় এই মেলা।

বালেশ্বর জেলা প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রতিদিন খোলা থাকে মন্দিরের দরজা। সমুদ্র সৈকত দিঘা থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরেই দাঁড়িয়ে আছে এই রহস্যে ঘেরা মন্দির। যুক্তির লড়াই দূরে সরিয়ে আপনিও কি একবার সাক্ষী হতে চান সেই উধাও হয়ে যাওয়া কাঠের অলৌকিক উপাখ্যানের? তবে গন্তব্য হোক চন্দনেশ্বর।

Follow Us