
মাসির বাড়ি থেকে আজ ফেরার পালা। আষাঢ় মাসের শুক্ল পক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে অনুষ্ঠিত এই রথযাত্রা শুক্লা একাদশীর দিন পূর্ণযাত্রা। এই সময়ে জপ ও হোমাদি অনুষ্ঠান বিধেয়। গত ১ জুলাই তিন দেবদেবী মাসির বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। এখন রয়েছেন মাসির বাড়িতেই। সেখানে চলছে নানান অনুষ্ঠান। ৯ জুলাই, মাসি বাড়ি থেকে তিন দেব-দেবী ফিরবেন শ্রীধামে। রপর দিনই হবে ১০ জুলাই সুনা বেশ যাত্রা। ২৩ জুলাই সম্পন্ন হবে নিলাদ্রি বিজে যাত্রা। তাই পুরীর মন্দিরের ফিরবেন বলে প্রস্তুতি তুঙ্গে।
পুরীর রথ যাত্রা ঘিরে যেমন নানান কাহিনি রয়েছে,তেমন রথযাত্রায় জগন্নাথের ভোগ ও তার রান্না ঘিরেও রয়েছে অজানা কাহিনি। যেগুলি শুনলে গা শিউরে ওঠে। কথিত রয়েছে একবার পুরীর মন্দিরের এক মহিলা কর্মী রোজই ভগবানকে প্রসাদ দিতে দিতে ভাবতেন নিজের হাতে একবার রান্না করে তিনি দেবতাকে খাওয়াবেন। দেবতাকে তিনি নিজের পুত্র রূপে দেখতেন। মহিলা কর্মীর মনের কথা জানতে পারেন স্বয়ং জগতের নাথ! এরপর তিনি এই মহিলার কাছে এসে রোজ খাবার খেতেন। পাতে থাকত খিচুড়ি। তবে এখানেই ঘটল বিপত্তি! জানা যায়, ঈশ্বর যখন ওই মহিলার হাতের রান্নায় মুগ্ধ তখনই ঘটে যায় বিপদ। তখন একদিন মহিলা তাঁর পাকশালায় খিচুড়ি তৈরি করছিলেন। তবে তিনি স্নান না করেই তা রান্না করছিলেন। ঘটনা দেখে ফেলেন এক সন্ন্যাসী। তিনি মহিলাকে তীব্র ভর্ৎসনা করে জানান যে, স্নান করে শুদ্ধ হয়ে তবেই দেবসেবা করা যায়। দেবতার ভোগ রান্নার কিছু নিয়মও শিখিয়ে দেন তাঁকে।
এরপর , একদিন স্নান সেরে মহিলা দেবতার জন্য ভোগ রান্না করতে গিয়ে দেরি করে ফেলেন। বহুক্ষণ অভূক্ত থাকেন দেবতা। খিদেয় কাতর হয়ে ওঠেন জগন্নাথ দেব। সেদিন ভোগ নিবেদন করতে অনেক দেরি হয়ে যায়। মন্দিরের পুরোহিত এসে দেখেন জগন্নাথ দেবের মুখে খিচুড়ি লেগে রয়েছে। অবশেষে পুরোহিতরা জগন্নাথ দেবের মুখে আসল ঘটনা শুনে কর্মাবাঈয়ের কাছে গিয়ে ক্ষমা চান। এই ঘটনার পরই সমস্ত কথা জানতে পারেন স্বয়ং জগতের নাথ। তখনই তাঁর নির্দেশ হয় যে সকালের আহারে বিনা স্নানেও ভোগ রান্না করা যায়। সেই নিয়ম অনুযায়ী পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে প্রতিদিন সকালে প্রভুর জন্য বানানো হয় বালক ভোগ। এই ভোগের খিচুড়িকে মনে করা হয় কর্মাবাঈয়ের খিচুড়ি।
ভোগ তৈরির রান্নাঘরও কম রহস্যে ঘেরা নয়। অদ্ভুত রান্নাঘর! অদ্ভুত পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রন্ধন যজ্ঞ! অদ্ভুত রান্নাঘর-পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রন্ধন যজ্ঞ পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের রান্নাঘরকে বলা হয় পৃথিবীর অদ্ভুত ও বড় রান্নাঘর। জগন্নাথ দেব আর লক্ষ্মী দেবীর কৃপায় ধন্য এই রান্না ঘর। তাইতো পুরীর এ রান্নাঘরকে অদ্ভুত রান্নাঘর বলেই অভিহিত করা হয়। জগন্নাথ দেবের ছাপ্পান্নভোগ কেন জগৎ সেরা প্রতিদিন শতাধিক রকমের ভোগ পৃথিবীর আর কোনো মন্দিরে হয় কিনা জানা নেই। জগন্নাথ মন্দির তৈরির সময় থেকেই এই নিয়ম চলে আসছে। প্রতিদিন কমপক্ষে ৫৬ রকম ভোগ রান্না করা হয়। আসলে সমস্ত ভোগই গরিব, নিরন্ন মানুষ এবং ভক্তদের মাঝে বিলি করা হয়। এজন্য বলা হয়ে থাকে, জগন্নাথ দেব নিজে যেমন খেতে ভালোবাসেন, তেমনি ভালোবাসেন ভক্ত-ভক্তদের খাওয়াতে। খরচেও কার্পণ্য করেন না। ছাপান্নভোগ হল একটি রাজদত্ত অনুষ্ঠান। এখানে কোন পুরাতন পাত্রে রান্না করা হয় না, প্রতিদিন নতুন নতুন পাত্রে রান্না করা হয়, তাই একদল খালি মাটি দিয়ে পাত্র বানায়, আরেক দল তা সরবরাহ করে রান্নাঘরে নিয়ে যায়। এই রান্নাঘরে বিবিধ দ্রব্য রান্না করার জন্য কোন বিদ্যুৎ বা যন্ত্র ব্যবহার করা হয় না। পুরোটাই কাঠের আগুনের উপর রান্না করা হয়।
প্রতিদিন ১০০টির উপর আইটেম রান্না করা হয় যা দুটি ভাগে বিভক্ত। এ দুটি ভাগকে পাক্কা এবং সুক্কা নামে ডাকা হয়। পাক্কা বলা হয় সে খাবারগুলো যেগুলো সিদ্ধ করা যেমন ডাল, চাল, খিচুরী এবং সমস্ত রকমের সবজি। অপরদিকে সুক্কা বলা হয় বিস্কিট, মিষ্টান্ন আর বিভিন্ন ধরনের পিঠা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, জগন্নাথের জন্য যেসমস্ত ফল ও সবজি ব্যবহার করা হয় সেগুলো দু হাজার বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। খরচেও কার্পণ্য করেন না। তাই রোজ খাওয়া খরচ এর জন্য ২ লাখ এর ওপর। বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে খরচা হয় লাগাম ছাড়া।