
কলকাতা : ম্যাচ দেখতে দেখতে বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিল আড়াই বছর আগের আমেদাবাদ। সেই অভিশপ্ত ১৯শে নভেম্বর রাতেও বিজিতদের মেডেল নিতে যাচ্ছিলেন সূর্যকুমার যাদব। গোটা দেশের অবস্থা যেন বিয়েবাড়ির মঞ্চে শ্রাদ্ধের ভোজ খাওয়ার মতো। কেউ সেদিন ভাবেইনি ভারত হারতে পারে। খুব স্বাভাবিক, টানা ১০ ম্যাচ অপরাজিত, শামির দুরন্ত ফর্ম, কিং কোহলির একের পর এক শতরান, শুরু থেকেই ফেভারিটের তালিকায় ছিল ভারত। সেদিন সব মাটি করে দিয়েছিলেন কোনও এক ট্র্যাভিস হেড। তাঁর ব্যাটেই বিশ্বকাপ স্বপ্ন আছাড় খেয়েছিল ভারতের। কাট টু, ৮ মার্চ ২০২৬ – টানা দুইবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের অনন্য রেকর্ড গড়ল ভারত। যে আমেদাবাদ স্টেডিয়াম নিয়ে এত কথা হয়েছিল, এত ‘অপয়া’ তকমা দেওয়া হয়েছিল, সেই স্টেডিয়ামেই অভিশাপ মুক্তি ঘটাল ভারত। ফাইনালে ভারত ওঠা ইস্তক এই মাঠ নিয়ে চূড়ান্ত ট্রোলিং হয়েছে বিসিসিআইকে নিয়ে। ভারত নিউজিল্যান্ডকে কোনওদিন টি টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হারাতে পারেনি, কোনও রবিবারে ভারত ফাইনাল জেতেনি, আমেদাবাদ ভারত জেতে না – চর্চা প্রচুর ছিল। আজকে ভারতীয় দল রিল আর রিয়েলের পার্থক্য যেন চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল।
আজ নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে টসে জিতে ফিল্ডিং নিয়েছিলেন কিউয়ি অধিনায়ক মিচেল স্যান্টনার। কিন্তু তাঁর সিদ্ধান্ত যে কত ভুল, চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখালেন অভিষেক ও সঞ্জু। এর আগে গোটা বিশ্বকাপেই জিম্বাবোয়ে ম্যাচ বাদ দিয়ে রান পাননি অভিষেক। আজ পেলেন, আজ তাঁর ২১ বলে ৫২ রানের ঝোড়ো ইনিংস প্রমাণ করল, কেন তিনি বিশ্বের এক নম্বর টি-টোয়েন্টি ব্যাটার। সঙ্গে অবশ্যই সঞ্জু। ৯৭*, ৮৯, ৮৯ – শেষ ৩ ম্যাচ থেকে যেন পুনর্জন্ম হয়েছে সঞ্জু স্যামসনের। আজও যে মুডে শুরু করেছিলেন, মনে হচ্ছিল ৩০০ রান তুলে দেবে ভারত। তুলতে যে পারল না, তার আধা কৃতিত্ব যদি নিউজিল্যান্ডকে দেওয়া হয়, বাকি শ্রেয় প্রাপ্য অবশ্যই ভারতীয় মিডল অর্ডারের ব্যর্থতায়। জিমি নিশাম একাই এক ওভারে ৩ উইকেট নিয়ে ধসিয়ে দিলেন ভারতকে। তাঁর ওভারে আউট হলেন সঞ্জু (৮৯), হার্দিক (১৮) ও সূর্য (০)। যদিও শিবম দুবের ৮ বলে ২৬ রানের সৌজন্যেই ২৫০ রানের গণ্ডি টপকে গেল ভারত। ব্যাটে নেমে শুরু থেকেই নিয়মিতভাবে উইকেট পড়তে থাকে নিউজিল্যান্ডের। পাওয়ার প্লেতেই ৩ উইকেট পড়ে যায় নিউজিল্যান্ডের। ফিন অ্যালেন (৯), রাচীন রবীন্দ্র (১), গ্লেন ফিলিপ্স (৩) – সবাই ব্যর্থ। একা লড়লেন টিম সেইফার্ট (৫২)। অধিনায়ক স্যান্টনার করলেন ৪৩। এছাড়া সবাই ব্যর্থ। ৪ উইকেট পেলেন বুমরা। ৩ উইকেট অক্ষর প্যাটেলের। ১ উইকেট বরুণ চক্রবর্তীর। ১৪ উইকেট নিয়ে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারী তিনিই। যাঁর নাম না বললেই নয়, অক্ষর প্যাটেল। আজকেও দুরন্ত পারফরম্যান্স তাঁর। ২৭ রান দিয়ে নিয়েছেন ৩ উইকেট। সেইসঙ্গে প্রমাণ করলেন, ২০ ওভারের ফরম্যাটে এখনও কতটা প্রাসঙ্গিক ভারতীয় ক্রিকেটের ‘বাপু’। ২৫৬ রানের জবাবে নিউজিল্যান্ড অল আউট ১৫৯ রানে। ৯৬ রানে জিতে রেকর্ড গড়ল ভারত। ক্রিকেটার হিসেবে ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিতলেন গৌতম গম্ভীর। আজ তাঁকে হাসতে দেখে জনৈক নিন্দুক বলছিলেন, এই জয়ের ফলে ভারতের কোচ হিসেবে আরও কয়েক বছর চাকরি পাকা গৌতমের।
আড়াই বছর আগে এই মাঠেই হেরে মুখ চুন হয়েছিল টিম ইন্ডিয়ার। আজ মাঠে কে না আসেননি ? কপিল দেব, মহেন্দ্র সিংহ ধোনি, রোহিত শর্মা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ – সবাই আশায় ছিলেন ভারতের জয়ের। এই মাঠ নিয়ে কম মিম দেখেনি সোশ্যাল মিডিয়া। আজকের পর আশা করি আর সেই মিম দেখা যাবে না। তবুও, নিন্দুকদের মুখ বন্ধ করবে কে ? ২০২৪ সালে সূর্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছিলেন খেলোয়াড় হিসেবে, আজ জিতলেন অধিনায়ক হিসেবে। পরের বিশ্বকাপে তিনি থাকবেন কি না জানিনা, তবে মনে হচ্ছে যাবতীয় প্রত্যাশার মাঝে প্রায় দেড় লাখি সমর্থকের সামনে দেশের ও মাঠের – দুয়েরই অভিশাপ তিনিই মুক্ত করে দিলেন বোধ হয়।