
কলকাতা : ২২ বছর। এই ২২ বছরে কত কিছু হয়ে যায়। শুধু আর্সেনালের (Arsenal) ট্রফি পাওয়া আর হয় না। এই অপবাদ এবার মুছতে চলেছে। ২২ বছর পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ (Premier League) জিতল আর্সেনাল। গতকাল ম্যান সিটির (Manchester City) সঙ্গে বোর্নমাউথের (Bournmouth) ম্যাচ ১-১ ড্র করার ফলেই চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেল আর্সেনাল। ২০০৪ সালে শেষবার অপরাজিত থেকে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্সেন ওয়েঙ্গারের (Arsen Wenger) আর্সেনাল। তারপরেই শুধু ট্রফি খরা, যা গতকাল (আজ মধ্যরাতে) মেটালেন রাইস (Declan Rice), গুইকারেসরা (Victor Gyökeres)।
এই বছর শুরু থেকেই দারুন ফর্মে ছিল মিকেল আর্তেতার (Mikel Arteta) ছেলেরা। তবে একসময় পিছিয়ে পড়ে তারা। চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দৌড়ে উঠে আসছিল ম্যানচেস্টার সিটি (Manchester City) । এমনকি প্রিমিয়ার লিগেও এই দুই দলের দ্বৈরথে একবার হার ও একবার ড্র করে ‘গানার্স’রা। তখন অনেক সমর্থকই ভাবছিলেন, এবারেও হয়ত ‘বটল’ করবে আর্সেনাল। কিন্তু এরপরেই কামব্যাক শুরু। একের পর এক ম্যাচ অপ্রতিরোধ্য থেকে ৮২ পয়েন্ট নিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেল আর্সেনাল। ৩৭ ম্যাচ খেলে ২৫ টি ম্যাচ জিতেছেন সাকা-রা। হেরেছেন মাত্র ৫ ম্যাচে। দুই নম্বরে ৭৮ পয়েন্ট নিয়ে রয়েছে ম্যান সিটি। ৩ নম্বরে ১০ পয়েন্ট পিছিয়ে রয়েছে ম্যান ইউ। তিন দলই খেলেছে ৩৭টি করে ম্যাচ। তবে এই ৪ পয়েন্টে এগিয়ে থাকাই ফারাক গড়ল আর্সেনালের।
কেন এই আর্সেনাল দল অপ্রতিরোধ্য?
১ – মিকেল আর্তেতার ট্যাকটিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি:-
পেপ গুয়ার্দিওলার সাবেক শিষ্য মিকেল আর্তেতা আর্সেনালে একটি নির্দিষ্ট ‘পজিশনাল প্লে’ বা জায়গা ধরে খেলার দর্শন তৈরী করেন। দল এখন হাই প্রেসিং ফুটবল খেলে, ফলে প্রতিপক্ষের পায়ে বল গেলেই দ্রুত তা কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখা ও প্রতিপক্ষের ডিফেন্স ভাঙার জন্য যা কার্যকর।
২ – শক্তিশালী ডিফেন্স লাইন-
আর্সেনালের রক্ষণ বা ডিফেন্স দারুন ফর্মে রয়েছে। উইলিয়াম সালিবা ও গ্যাব্রিয়েল মার্গেলহাসের সেন্ট্রাল ডিফেন্স জুটি এককথায় অভেদ্য। এমনকি গোলকিপার হিসেবে ডেভিড রায়ের দারুন পারফরম্যান্স ও বল ডিস্ট্রিবিউশন দলকে কাউন্টার অ্যাটাক করতে সাহায্য করেছে।
৩ – মাঝমাঠে ‘রাইস এফেক্ট’ –
ডেক্লান রাইস দলে আসার পরেই মাঝমাঠের চেহারা বদলে গিয়েছে। তিনি একদিকে যেমন ডিফেন্সকে নেতৃত্ব দেন, তেমনই আক্রমনও সমান ভাবে করেন। তাঁর দুরন্ত ওয়ার্ক রেট ও বল কেড়ে নেওয়ার ক্ষমতা আর্সেনালকে মাঝমাঠ থেকেই নিয়ন্ত্রন করে।
৪- ক্যাপ্টেন ‘কুল’ ওডেগার্ড –
দলের ক্যাপ্টেন মার্টিন ওডেগার্ড দলের আক্রমনের মূল চাবিকাঠি। তাঁর ক্রিয়েটিভিটি, পাসিং অ্যাকুরেসি ও প্রেসিং-এর ক্ষমতা দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেয়। বুকায়ো সাকা ও ওডেগার্ডের পার্টনারশিপ যেকোনও দলের জন্যই আতঙ্ক।
৫- সেট-পিস থেকে গোল করার দক্ষতা-
আর্সেনালের অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠার পেছনে আসল নায়ক তাদের ডেড বল কোচ নিকোলাস ওভারগার্ড। কর্নার বা ফ্রি-কিক থেকে গোল করার ক্ষেত্রে আর্সেনাল বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম সেরা। বেশ কিছু সময় তাদের ফ্রি-কিক থেকে আসা গোলই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিয়েছে।
৬ – ইস্পাত কঠিন মন –
বিগত বছরগুলিতে অল্পের জন্য প্রিমিয়ার লীগ হাতছাড়া হলেও দলটির মানসিকতায় এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে। এখন তারা অনেক বেশি পরিণত। এমনকি কাই হ্যাভার্টজ ও লিয়ান্দ্রো টোসার্ডের মতো খেলোয়াড়রাও ম্যাচের ফারাক গড়ে দেন।
২০০৩-০৪ সিজনে একটিও ম্যাচ না হেরে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আর্সেন ওয়েঙ্গারের আর্সেনাল। সেই বছর ৩৮ ম্যাচ খেলে ২৬ ম্যাচ জিতে মোট ৯০ পয়েন্ট পেয়েছিলেন থিয়েরি অঁরিরা। এই কারণেই সেই দলকে বলা হয় ‘দ্য ইনভিন্সিবল’। ২২ বছর পর আবার ইংল্যান্ড সেরা হলেন সালিবা-গ্যাব্রিয়েলরা। একই সঙ্গে আবার ট্রফি জেতার সুযোগ রয়েছে আর্সেনালের সামনে। আগামী ৩০ মে ইউরোপ সেরা হওয়ার লক্ষ্যে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল খেলতে বুদাপেস্টে নামবে আর্সেনাল। প্রতিপক্ষ লুই এনরিকের পিএসজি, যারা গত বছর ইউসিএল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। অতীতে একবারও ইউসিএল চ্যাম্পিয়ন হয়নি গানার্সরা, ফলে এই ট্রফিও প্রথমবার জয়ের সুযোগ রয়েছে লাল-সাদা দলের। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এই বছর চ্যাম্পিয়ন্স লিগে একটি ম্যাচেও হারেনি আর্সেনাল। ১৪ ম্যাচ খেলে ১১ ম্যাচেই জিতেছে তারা, এর মধ্যে ৮টি গ্ৰুপ পর্যায়ের ম্যাচের সব ম্যাচেই জিতেছিল মিকেল আর্তেতার দল। ফলে, অপরাজিত থেকে ইউসিএল খেতাব জয়ের দিকে এগিয়ে আর্সেনাল।