EXPLAINED: হোয়াটসঅ্যাপ বনাম টেলিগ্রাম! কার মেসেজ বেশি সুরক্ষিত?
WhatsApp vs Telegram: মেটা-র দাবি, মেসেজ যাওয়ার পথটুকুও সর্বক্ষণ সেটার গায়ে তালাটা ঝোলে। কেউ যদি মাঝপথে ওই 'এনক্রিপশন' ভেঙে চ্যাটে ঢোকার চেষ্টা করে, তাহলে সে কয়েকটি এলোমেলো ইংরেজি বর্ণমালা দেখতে পাবে মাত্র। এটাকে বলে সাইফার-টেক্সট। মেটা-র দাবি, এই তালা একজন ইউজারকে আলাদা করে লাগাতে হয় না মেসেজে। এটা নিজে থেকেই লেগে যায়। আর ঠিক মেটা-র এই দাবিকেই নস্যাৎ করে আসরে উদয় হয়েছে টেলিগ্রামের সিইও পাভেলের। পড়ুন টিভি৯ বাংলার বিশেষ প্রতিবেদন....

সোশ্যাল মিডিয়ায় ধুন্ধুমার লড়াই চলছে। একদিকে বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ, অন্যদিকে, সবচেয়ে সুরক্ষিত বলে দাবি করা অ্যাপ, টেলিগ্রাম। কোন দিকে পাল্লা ভারী? বাংলা যখন ভোটের লড়াইয়ে মেতে, তখন বিশ্বের টেক দুনিয়ায় আরেকটা লড়াই চলছে। চলছে সকলের চোখের সামনেই, এক্স (সাবেক টুইটারে) মাধ্যমে। এই লড়াইয়ে আবার আচমকাই প্রবেশ ঘটেছে মার্কিন ধনকুবের ও এক্স-এর মালিক ইলন মাস্কের। কোন ঘটনাকে কেন্দ্র করে লড়াই? লড়াই, এই সব জনপ্রিয় অ্যাপ ব্যবহারকারী বা ইউজারদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিয়ে।
বিতর্কের সূত্রপাত, টেলিগ্রাম অ্যাপের প্রতিষ্ঠাতা, রুশ ধনকুবের পাভেল ডুরভ-এর একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে সম্প্রতি পাভেল লেখেন, “দিনের পর দিন মানুষকে বোকা বানাচ্ছে হোয়াটসঅ্যাপ। ‘এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন’-এর নামে গ্রাহকদের বেকুব বানাচ্ছে। এই গোপনীয়তা রক্ষার দাবি আসলে ‘কনজিউমার ফ্রড’। ৯৫ শতাংশ হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজই সাদামাটা টেক্সট ফরম্যাটে অ্যাপল বা গুগলের সার্ভারে ব্যাক-আপ হিসাবে জমা হয়। আর এনক্রিপশন বিষয়টিই ‘অপশনাল’, অধিকাংশ ইউজারই সেটাকে ‘অন’ করেন না।” পাভেলের দাবি, কোনও হোয়াটসঅ্যাপ ইউজার যদি এনক্রিপশন ‘অন’ করেন-ও, তাহলেও আরেকজনের সঙ্গে কথা বলার সময় সেই সব মেসেজ ‘লিক’ হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে। কারণ, উল্টোদিকের ব্যক্তিটি হয়তো তাঁর ডিভাইসে এনক্রিপশন ‘অন’ করেননি। একজন ইউজারের কন্ট্যাক্ট লিস্টে থাকা ৯০ শতাংশ পরিচিত ব্যক্তিই ‘ব্যাকআপ এনক্রিপশন’ ‘অন’ করে রাখেন না। সেই সব চ্যাট সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায় কোনও সার্ভারে গিয়ে জমা হয়।
পাভেলের এই দাবি প্রযুক্তি মহলে নতুন করে পুরনো বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। কী সেই বিতর্ক? বিতর্ক ইউজারদের গোপনীয়তাকে ঘিরে। সহজ করে বলছি, ধরুন আপনি একটি মেসেজ আপনার বন্ধুকে পাঠালেন। সেটা হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, সিগন্যাল বা ফেসবুক মেসেঞ্জার- যে কোনও মাধ্যমে হতে পারে। এখন এই সবকটি মেসেজিং অ্যাপ নির্মাণকারী সংস্থাই দাবি করে, তাদের তৈরি করা অ্যাপ্লিকেশনই সবচেয়ে সুরক্ষিত। সুরক্ষিত কোন অর্থে? দু’জন ব্যক্তির মধ্যে যে আলোচনাই হোক না কেন সেটা তৃতীয় কোনও ব্যক্তি পড়তে পারবে না। মানে চূড়ান্ত গোপনীয়তা বজায় থাকবে। এমনকী, কোনও দেশের সরকার বা তদন্তকারী সংস্থার কেউ-ই আপনার ও আপনার বন্ধুর মধ্যে হওয়া কথোপকথন পড়তে বা লেনদেন হওয়া ছবি-ডকুমেন্ট দেখতে পারবে না। লিগ্যাল ওয়ারেন্ট থাকলে বড়জোর কার সঙ্গে কথা বলেছেন, কতক্ষণ বলেছেন– এটুকু জানতে পারবে। যেটাকে ‘মেটাডেটা’ বলে।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মানুষ আজ যে অ্যাপ ব্যবহার করেন, সেই হোয়াটসঅ্যাপ এখন মার্ক জুকারবার্গের মালিকানাধীন মেটা-র অধিকৃত সংস্থা। গোপনীয়তা নিয়ে সবচেয়ে বেশি ঢাক পেটায় হোয়াটসঅ্যাপ-ই। তাদের বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়, হোয়াটসঅ্যাপ নিজেও দু’জন ব্যক্তির মধ্যে হওয়া চ্যাট পড়তে পারে না। কারণ, ওই যেটা দিয়ে প্রতিবেদন শুরু করেছিলাম, সেই এন্ড টু এন্ড এনক্রিপশন। বিষয়টা অনেকটা তালা-চাবির মতো। মানে আপনি যেই একটা মেসেজ পাঠালেন, ওমনি ওই মেসেজের চারপাশে একটা তালা লেগে যায়। একমাত্র যাঁর ফোনে ওই মেসেজ যাচ্ছে, তাঁর কাছেই সেই তালার চাবি রয়েছে। মেটা-র দাবি, মেসেজ যাওয়ার পথটুকুও সর্বক্ষণ সেটার গায়ে তালাটা ঝোলে। কেউ যদি মাঝপথে ওই ‘এনক্রিপশন’ ভেঙে চ্যাটে ঢোকার চেষ্টা করে, তাহলে সে কয়েকটি এলোমেলো ইংরেজি বর্ণমালা দেখতে পাবে মাত্র। এটাকে বলে সাইফার-টেক্সট। মেটা-র দাবি, এই তালা একজন ইউজারকে আলাদা করে লাগাতে হয় না মেসেজে। এটা নিজে থেকেই লেগে যায়। আর ঠিক মেটা-র এই দাবিকেই নস্যাৎ করে আসরে উদয় হয়েছে টেলিগ্রামের সিইও পাভেলের। তাঁর দাবি, এমন বহু মামলা মার্কিন আদালতে আজও বিচারাধীন যেখানে মেটা-র কর্মচারী বা ‘অ্যাসেনচার’-এর মতো সংস্থা ঘুরপথে এনক্রিপশন ভেঙে গোপন চ্যাট পড়েছে। মেটাডেটা সংরক্ষণের নামে আসলে ইউজারদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা খোলাখুলি ফাঁস হচ্ছে, দাবি পাভেলের। পাভেলের দাবিকে আংশিক সত্যি বলে মেনেও নিচ্ছেন তাবড় বিশেষজ্ঞরা। কারণ, ‘ব্যাক-আপ চ্যাট’ সত্যি ‘এন্ড টু এন্ড এনক্রিপ্টেড’ থাকে না বলছেন অনেক প্রযুক্তিবিদরাও।
তবে পাভেলের সব দাবি অবশ্যই যুক্তিগ্রাহ্য নয় বলেও বলছেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, পাভেলের দাবিতে শব্দের খেলা বা ‘জাগলারি’ রয়েছে। পাভেল হোয়াটসঅ্যাপের প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থা টেলিগ্রামের সিইও। তাঁর ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে। তাঁকে রাশিয়ার মার্ক জুকারবার্গ-ও বলা হয়। ২০১৪ থেকে তিনি রাশিয়া-ছাড়া। তার আগে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় সোশ্যাল মিডিয়া নেটওয়ার্ক VK তৈরি করেন। কিন্তু পুতিনের নির্দেশ মোতাবেক ইউজারদের তথ্য রুশ গোয়েন্দাদের কাছে দেননি বলে তাঁকে VK থেকে অপসারিত করা হয়। পরে পাভেল টেলিগ্রাম তৈরি করেন। যেখানে ইউজারদের ‘সিক্রেট চ্যাট’ কোনও ক্লাউড ব্যাকআপে সংরক্ষিত হয় না। কেউ পড়তে পারেন না। কোনও মেটাডেটা থাকে না। তবে টেলিগ্রামের এত রাখঢাক নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে। ফ্রান্সের আদালতে পাভেলকে সন্ত্রাসবাদে মদতদাতা বলে মামলা দায়ের হয়। যদিও পাভেল সে সময় দাবি করেন, জঙ্গিরা টেলিগ্রাম ব্যবহার করে বলে এই নয় যে তিনি সন্ত্রাসবাদীদের সাহায্য করেন। গ্রাহকের সংখ্যায় টেলিগ্রাম-ও কম যায় না। আজ যেখানে প্রায় ৩০০ কোটি মানুষ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করেন, সেখানে টেলিগ্রাম ব্যবহার করেন প্রায় ১০০ কোটি মানুষ। দুটি অ্যাপ-ই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ভারতে।
কী বলছেন ইলম মাস্ক?
এবার এই দুটি অ্যাপের মধ্যে লড়াইয়ের মধ্যে রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব হয় আরেক তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থা এক্স-এর মালিক ইলন মাস্কের। এক্স-ও এখন চ্যাট পরিষেবা শুরু করেছে। পাভেলের পোস্ট শেয়ার করে সঙ্গে ইলন মাস্ক লেখেন, ‘হোয়াটঅ্যাপ নিরাপদ নয়। এক্স-এর চ্যাট বা প্রাইভেট মেসেজ ব্যবহার করুন।’ প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মেটা বিবৃতি দেয়, ‘এই ধরনের দাবি মিথ্যা, ভুল। মেটা কাউকে হোয়াটঅ্যাপের মেসেজ পড়ার অনুমতি দেয় না।’ সংস্থার কর্তা উইল ক্যাথকার্ট বলেন, “কোন যন্ত্রণা থেকে পাভেলকে এই ধরনের আক্রমণ করতে হয় বুঝি। আসলে টেলিগ্রামের প্রাইভেসি কম। তাই এসব বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা। আপনাদের (ব্যবহারকারী) সব হোয়াটঅ্যাপ চ্যাট নিরাপদ।”
