
ঝাড়গ্রাম: নেই কোনও প্রতিমা। মন্দিরের লাল মেঝে, দেওয়ালের প্রাচীন শিল্পকলা, পুরনো দিনের ঝাড়বাতি আর পটচিত্রেই যেন থমকে রয়েছে সময়। চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে একই রীতি মেনে পূজিত হয়ে আসছেন ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির (Jhargram Rajbari) কুলদেবী মা সাবিত্রী। এখানে মূর্তিপুজো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দেবীর আরাধনা হয় পটচিত্রে। বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মেনে আজ, শনিবার ষষ্ঠী এবং আগামীকাল সপ্তমী পালিত হবে রাজবাড়ির পুজোয়। সময়ের সঙ্গে দুর্গাপুজোয় (Durga Puja 2026) আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলেও ঝাড়গ্রামের মল্লদেব রাজপরিবারের এই পুজোর রীতিনীতি ও নির্ঘণ্টের কোনও পরিবর্তন হয়নি।
ঝাড়গ্রামের প্রাচীন পুজোগুলির মধ্যে অন্যতম সাবিত্রী মন্দিরের পুজো। কথিত আছে, ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দে রাজা সর্বেশ্বর সিং চৌহান এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময় গোটা এলাকা ছিল ঘন জঙ্গলে ঢাকা। এককালের রাজার গড়, অর্থাৎ বর্তমান অরণ্যশহরের পুরনো ঝাড়গ্রাম এলাকাতেই রয়েছে রাজপরিবারের কুলদেবী মা সাবিত্রীর মন্দির।
এই পুজোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, এখানে দেবীর কোনও মূর্তি তৈরি হয় না। পটচিত্রেই আরাধনা করা হয় মা সাবিত্রীর। ঝাড়গ্রামের একমাত্র পটের দুর্গাপুজো হিসাবেও পরিচিত এই পুজো। মন্দিরের অন্দরমহলে এখনও ছড়িয়ে রয়েছে রাজকীয় ঐতিহ্যের ছাপ। লাল মেঝে, প্রাচীন দেওয়ালচিত্র, ঝাড়বাতি থেকে শুরু করে পটচিত্র, সবকিছুই কয়েকশো বছরের ইতিহাসের সাক্ষী।
সাধারণত ষষ্ঠী থেকে দুর্গাপুজোর মূল আচার শুরু হলেও ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজোর নিয়ম একেবারেই আলাদা। এখানে দেবীপক্ষের অপেক্ষা করা হয় না। পিতৃপক্ষেই শুরু হয়ে যায় দেবীর আবাহন। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের নবমী তিথিতে, অর্থাৎ জিতাষ্টমী বা ছিতা অষ্টমী পর্ব থেকে পুজোর সূচনা হয়। দুর্গাপুজোর প্রায় ১৫ দিন আগে মঙ্গলঘট স্থাপন করে শুরু হয় দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস।
মহালয়ার দিন হয় চণ্ডীপাঠ। এরপর নির্দিষ্ট তিথি মেনে চলে দেবীর আরাধনা। পুজোর দিনগুলিতে মাকে নিবেদন করা হয় অন্নভোগ। রাজপরিবারের প্রাচীন নিয়ম মেনেই সম্পন্ন হয় সমস্ত আচার-অনুষ্ঠান। বিশুদ্ধ পঞ্জিকার নির্ঘণ্ট অনুসরণ করায় অন্যান্য পুজোর সঙ্গে এখানকার তিথি পালনে পার্থক্যও দেখা যায়। সেই নিয়মেই আজ ষষ্ঠী এবং আগামীকাল সপ্তমীর পুজো।
শুধু পটের আরাধনাই নয়, ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও এক বিশেষ ঐতিহ্য। এই পুজোয় দেবীকে শক্তির প্রতীক হিসাবে আরাধনা করা হয়। দশমীতে রয়েছে পাঁঠাবলির প্রথা। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল ‘পাটাবিদা’ অনুষ্ঠান। রাজপরিবারের প্রাচীন রীতি অনুযায়ী, এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতীকী শত্রুনিধন করা হয়। অস্ত্রপুজোর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় দেবীর আরাধনা।
একসময় রাজকীয় আড়ম্বর ও জাঁকজমকে ভরপুর ছিল এই পুজো। সময়ের সঙ্গে সেই জৌলুস অনেকটাই ফিকে হয়েছে। তবে বদলায়নি প্রাচীন রীতিনীতি। আজও একই নিষ্ঠায় চলে আসছে মা সাবিত্রীর আরাধনা। প্রতিবছর দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন এই মন্দিরে।