
লন্ডন:ফের উত্তপ্ত ইউরোপের একাধিক দেশ। শনিবার বিক্ষোভের আগুন জ্বলছে ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল, আলবেনিয়া এবং বেলজিয়াম। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদে সামিল লক্ষ লক্ষ মানুষ। কোথাও বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও, কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং দোকানে লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে বলে খবর। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে একাধিক শহরে হাজার হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। কোথাও কোথাও জারি হয়েছে কড়া বিধিনিষেধও।
ফ্রান্সে বিক্ষোভের জেরে প্রায় এক হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অন্যদিকে, গত সপ্তাহান্তে হিংসা ও লুটপাটের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে ইতালির মিলানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে সরকার। এদিকে, স্পেনের বার্সেলোনায় দোকানে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠেছে। রোম, তুরিন, ব্রাসেলস এবং তিরানায় বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করেছে পুলিশ।
বিক্ষোভের পিছনে রয়েছে একাধিক অসন্তোষ। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ, বাসস্থানের আকাশছোঁয়া দাম ও ভাড়া, কম বেতন, শিক্ষার ব্যয়, সরকারি পরিষেবার অবনতি এবং সরকারের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকেই রাস্তায় নেমেছেন বহু মানুষ। পরপর দুই সপ্তাহ ধরে বিক্ষোভ এবং সংঘর্ষ ইউরোপের সরকারগুলির কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
শনিবারের বিক্ষোভে উত্তপ্ত হয় ফ্রান্স। জানা গিয়েছে, বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ৪ লক্ষ ১০ হাজার মানুষ। যদিও শ্রমিক সংগঠনগুলির দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রায় ৭০ হাজার পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়। একাধিক শহরে বিক্ষোভ ঘিরে বিধিনিষেধও জারি করা হয়েছিল। দিনের বেলায় অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণ থাকলেও সন্ধ্যার পর প্যারিস-সহ বেশ কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ শুরু হয়।
প্যারিসে পোর্ট দ্য ইতালি থেকে পোর্ট দ্য ভিনসেন পর্যন্ত মিছিল এগোনোর সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একাংশ বিক্ষোভকারী অস্থায়ী ব্যারিকেড তৈরি করেন এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ওঠে। মুখ ঢাকা কয়েক জন যুবক একটি গাড়ির শোরুমের কাচ ভেঙে দেন। পাল্টা লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। গত সপ্তাহান্তে যে মাত্রায় লুটপাট ও ভাঙচুর হয়েছিল, শনিবার এখনও পর্যন্ত পরিস্থিতি সেই পর্যায়ে পৌঁছয়নি। গত সপ্তাহে একাধিক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছিল এবং বেশ কয়েকটি ভবনে আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছিল।
জীবনযাত্রার খরচ, কম বেতন, সরকারি পরিষেবা, সামরিক খাতে ব্যয় এবং সরকারের নীতির প্রতিবাদে শনিবার ইতালির মিলান, রোম ও তুরিন-সহ একাধিক শহরে বিক্ষোভ দেখান হাজার হাজার মানুষ। বিক্ষোভকারীদের বড় অংশই ছিলেন তরুণ। গত সপ্তাহান্তে লুটপাট ও সংঘর্ষের ঘটনার পর মিলানে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি শহরে অতিরিক্ত ৫০০ সেনা মোতায়েনের কথা ঘোষণা করেছেন। আগে থেকেই সেখানে কয়েকশো সেনা মোতায়েন ছিলেন।
স্পেনের বার্সেলোনায় শনিবার সন্ধ্যায় ব্যাপক অশান্তি ছড়ায়। মুখ ঢাকা বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে দোকানে লুটপাট এবং রাস্তার বিভিন্ন সামগ্রীতে আগুন লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। শহরের কেন্দ্রস্থল প্লাসা দে কাতালুনিয়া এলাকায় একাধিক দোকান আক্রান্ত হয়। এই ঘটনায় প্রায় ১০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, কালো পোশাক পরা মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা দোকানের কাচ ভেঙে ভিতরে ঢুকছেন এবং জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছেন।
পর্তুগালের বিভিন্ন শহরে শনিবার আবাসনের খরচ কমানোর দাবিতে বিক্ষোভ দেখান হাজার হাজার মানুষ। বাড়ি ও ফ্ল্যাটের দাম এবং ভাড়া ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে বাসস্থান, এই অভিযোগেই সরব হন তাঁরা। রাজধানী লিসবনে সরকারের ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত পদক্ষেপ এবং ভাড়া দিতে ব্যর্থ ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদ সহজ করার উদ্যোগের বিরোধিতা করেন বিক্ষোভকারীরা।
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রকের দফতরের সামনে বিক্ষোভে শামিল হন পড়ুয়ারা। তাঁদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি কমাতে হবে, শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং প্রধানমন্ত্রী এদি রামাকে পদত্যাগ করতে হবে। পড়ুয়াদের বিক্ষোভ বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে মিশে যায়। একাংশ বিক্ষোভকারী পুলিশ ও বিভিন্ন ভবন লক্ষ্য করে পাথর ছোড়েন। পাল্টা জলকামান ব্যবহার করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজধানীতে আড়াই হাজারেরও বেশি পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়।
বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ছাত্র বিক্ষোভের জেরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিক্ষোভকারীদের তৈরি ব্যারিকেড সরাতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। নতুন করে লুটপাট ও ভাঙচুরের আশঙ্কায় বিলাসবহুল বিপণি এবং নামী ব্র্যান্ডের দোকানগুলির জানলা-দরজা বোর্ড দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। একটি ঘটনায় ভাড়ার স্কুটার, রাস্তার সাইনবোর্ড ও সাইকেলের স্তূপে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা।
পরপর দ্বিতীয় সপ্তাহান্তে ইউরোপের একাধিক দেশে বিক্ষোভ এবং সংঘর্ষের ঘটনা স্পষ্ট করে দিয়েছে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভের পিছনে রয়েছে নানা ধরনের সমস্যা। কোথাও জীবনযাত্রার খরচ ও কম বেতন, কোথাও আবাসন সঙ্কট, কোথাও শিক্ষার ব্যয় কিংবা পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ—দেশভেদে আন্দোলনের কারণ আলাদা। এর পাশাপাশি গাজায় যুদ্ধ এবং সেই বিষয়ে বিভিন্ন সরকারের অবস্থান নিয়েও প্রতিবাদ দেখা গিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কোথাও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, কোথাও সেনা নামানো হয়েছে। আবার বেশ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে প্রশাসন।