
জেরুজালেম: ফ্লাইদুবাই বিমানের ঘটনায় ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরকে স্যালুট জানাচ্ছে গোটা দুনিয়া। শতাধিক যাত্রীর প্রাণ বাঁচিয়ে আজ তিনি সকলের হিরো। সেদিন ককপিটে ভয়াবহ হামলার ঘটনায় এবার মুখ খুললেন ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। বিমানের ভিতরে ঠিক কী ঘটেছিল, কীভাবে কো-পাইলট তাঁকে আক্রমণ করেছিলেন এবং কীভাবে শেষ মুহূর্তে ককপিটের দরজা খুলে যাত্রীদের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল, সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন তিনি।
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে ভিডিয়ো কলে কথা বলার সময় গোটা ঘটনার বিবরণ দেন মচ্ছর। তাঁর সাহস এবং উপস্থিত বুদ্ধির প্রশংসা করে তাঁকে ‘হিরো’ বলেন নেতানিয়াহু। একইসঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁকেও ইজরায়েলের পরবর্তী স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বিশেষ সম্মান জানানোর জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন নেতানিয়াহু।
মচ্ছরের কথায়, ৩০ সেপ্টেম্বর দুবাই থেকে তেল আভিভগামী ফ্লাইদুবাই (Flydubai)-এর এফজেড১০৭৩ (FZ1073) বিমানে সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। আচমকাই কো-পাইলট প্রার্থনা করার জন্য নিজের সিট থেকে উঠে দাঁড়ান। বিষয়টি খুব স্বাভাবিক হওয়ায়, ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর সম্মান দেখিয়ে পিছনে না তাকিয়ে, সামনের দিকে তাকিয়েই ছিলেন।
এর কয়েক মিনিট পর আচমকাই মাথার পিছনে জোরালো আঘাত করা হয় মচ্ছরকে। প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, হয়তো বিমানের কোনও অংশে সমস্যা হয়েছে বা কোনওভাবে বিমানটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেই কারণে তীব্র ঝাঁকুনিতে আঘাত লাগল। কিন্তু পরপর আরও আঘাত আসতে থাকলে তিনি বুঝতে পারেন, বিমান নয়, তাঁর পাশেই থাকা কো-পাইলট তাঁকে মারছেন।
মচ্ছর বলেন, “প্রথম আঘাতগুলির পর আমার দৃষ্টি প্রায় ঝাপসা হয়ে গিয়েছিল। কো-পাইলটকে আটকানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।”
এর মধ্যেই তিনি বুঝতে পারেন, বিমানটি দ্রুত নীচের দিকে নামছে। সেই সময় তাঁর স্মৃতি পুরোপুরি পরিষ্কার না থাকলেও ঘটনাগুলি টুকরো টুকরো করে মনে আছে বলে জানান।
একবার ককপিটের দরজা খোলারও চেষ্টা করেছিলেন মচ্ছর। কিন্তু কো-পাইলট ফের দরজা বন্ধ করে দেন। এরপর ককপিটের মেঝেতে পড়ে থাকা অবস্থায় তিনি বিমানের ভিতর থেকে যাত্রীদের চিৎকার এবং তীব্র শব্দ শুনতে পান।সেই মুহূর্তে তিনি বুঝতে পারেন, আর কিছু না করলে তাঁর নিজেরও মৃত্যু হতে পারে, পাশাপাশি বিপদের মুখে পড়বেন বিমানের যাত্রীরাও।
মচ্ছরের কথায়, সেটিই ছিল তাঁর কাছে শেষ সুযোগ। শরীরে আর খুব বেশি শক্তি না থাকলেও তিনি সমস্ত শক্তি দিয়ে ককপিটের দরজার দিকে এগিয়ে যান।
তিনি জানান, বাইরে থেকে দরজাটি কোড ব্যবহার করে খোলার চেষ্টা করা হচ্ছিল। কিন্তু কো-পাইলট তা করতে দিচ্ছিলেন না। ভিতর থেকে দরজা খোলার জন্য একটি নব ঘুরিয়ে দিতে হয়। কোনওরকমে সেই নবের কাছে পৌঁছে সেটি ঘুরিয়ে দরজা খুলে দেন মচ্ছর। দরজা খুলতেই বাইরে থাকা যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা দ্রুত ককপিটে ঢুকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ঘটনার পর বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুকে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই বিমানটি নিরাপদে অবতরণ করে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহির কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে ‘সন্ত্রাসবাদী হামলার চেষ্টা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। অভিযোগ, ওমানের নাগরিক কো-পাইলট ককপিটের ভিতরে থাকা ক্র্যাশ অ্যাক্স দিয়ে ক্যাপ্টেন মচ্ছরের উপর হামলা করেছিলেন।
মচ্ছরের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর সাহস এবং উপস্থিত বুদ্ধির ভূয়সী প্রশংসা করেন ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতেও মাচ্ছার যেভাবে ঠান্ডা মাথায় কাজ করেছেন, তা তাঁকে মুগ্ধ করেছে।
নেতানিয়াহু বলেন, “মাচ্ছার শুধু নিজের জীবন নয়, বিমানে থাকা বহু মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছেন। এই সাহস সারা বিশ্বের মানুষের কাছে অনুপ্রেরণা।”
ওই দিনের ঘটনার পর মচ্ছরের চিকিৎসায় সাহায্য করেছিলেন এক ইজরায়েলি দন্ত চিকিৎসক। নেতানিয়াহু সেই চিকিৎসকের কথাও উল্লেখ করেন। এর উত্তরে মচ্ছর জানান, তিনি ওই চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে চান। তাঁর কথায়, ওই চিকিৎসক তাঁর জীবন বাঁচিয়েছেন।
কথোপকথনের শেষে মচ্ছরকে বিশেষ সম্মান জানানোর ঘোষণা করেন নেতানিয়াহু। তিনি ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ইজরায়েলের পরবর্তী স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।
নেতানিয়াহু জানান, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে সাধারণত ইজরায়েলের নাগরিকদেরই এই সম্মান দেওয়া হয়। তবে মচ্ছরের সাহসিকতার জন্য তাঁকে এই বিশেষ সম্মান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ঘটনার সময় পাওয়া চোট থেকে সুস্থ হয়ে উঠছেন ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। তাঁর বর্ণনায় স্পষ্ট, কয়েক মিনিটের সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে নিজের প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছিলেন তিনি।