
এক যুগেরও বেশি পরিকল্পনা। অপারেশনের জন্য লাগল মাত্র ৬০ সেকেন্ড। ইরানের সুপ্রিম লিডার ৮৬ বছরের আয়াতোল্লা আলি খামেনেইকে নিকেশের ছক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা CIA-র একদিনের নয়। অন্তত গত ৬ মাস ধরে CIA ও ইজরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ একযোগে খামেনেইকে খতম করার ছক কষছিল। মাথায় রাখতে হবে, মোসাদ কিন্তু কুখ্যাত হামাস বা হেজবোল্লাহ নেতাদের নিকেশ করলেও একজন সুপ্রিম লিডারকে এর আগে মারেনি। কিন্তু অপারেশন রাইজিং লায়ন-এ সেটাই করে দেখাল মোসাদ ও ইজরায়েলি বায়ুসেনা। এই হত্যার ছক কিন্তু একদিনের নয়।
মধ্য তেহরানে যে পাঁচিল ঘেরা কমপ্লেক্সে খামেনেই সপরিবারে থাকেন, তার উপর নজর রাখছিল কয়েক কোটি ডলার দামের মার্কিন গোয়েন্দা স্যাটেলাইট। খামেনেই কখন কী করেন, কার কার সঙ্গে দেখা করেন- সব খুঁটিনাটি তথ্য CIA জোগাড় করছিল। একে বলে বিহেভেরিয়াল প্যাটার্ন। সেই সব ‘বিশ্বস্ত’ তথ্য মার্কিন গোয়েন্দারা মোসাদ ও ইজরায়েলি প্রশাসনকে সরবরাহ করছিল নিয়মিত। শনিবার সকালে আচমকাই খামেনেই-কে খতম করার সুবর্ণ সুযোগ হাতে এসে যায় CIA ও মোসাদের হাতে। CIA-র কাছে থেকে খামেনেইয়ের অবস্থানের নিখুঁত তথ্য পেয়ে উড়ান ভরে ইজরায়েলি বায়ুসেনা। লঙ রেঞ্জ প্রিসিশন গাইডেড বোমা নিয়ে উড়ে যায় তেহরানের দিকে। স্থানীয় সময় সকাল ৯টা বেজে ৪০ মিনিটে যুদ্ধবিমান থেকে হাই সিকিউরিটি কমপ্লেক্সে পরপর আছড়ে পড়ে ৩০টি বোমা। এক একটি বোমা ফেলতে লেগেছে মাত্র ২ সেকেন্ড করে। সবমিলিয়ে গোটা অপারেশনে লাগে মাত্র ৬০ সেকেন্ড।
খতম হন খামেনেই। একা নন, তাঁর সঙ্গেই ইজরায়েলি বোমায় নিহত হন IRGC-র কমান্ডার ইন চিফ মহম্মদ পাকপর, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ-সহ ইরানি মিলিটারি কাউন্সিলের প্রধান আলি শামখানি, এয়েরোস্পেস বিভাগের প্রধান মাজিদ মৌসুভি, ডেপুটি ইন্টেলিজেন্স মন্ত্রী মহম্মদ শিরাজী-ও। ইজরায়েলি সেনা সূত্রে খবর, এই অভিযানের সবচেয়ে কঠিন কাজটা করে CIA। মার্কিন গোয়েন্দারাই ইজরায়েলি সেনাকে জানায়, শনিবার সকালে খামেনেই ও তাঁর ঘনিষ্ঠ অন্তত ৬০ জন একই সময়ে ওই একই কমপ্লেক্সে জড়ো হবেন। মার্কিন ও ইজরায়েলি চরেরা গত কয়েক বছর ধরে তেহরানের মাটিতে খামেনেইয়ের সব খুঁটিনাটি খবর সংগ্রহ করছিলেন। খামেনেই-এর নামে তাঁর প্রতি মুহূর্তের কার্যকলাপের তথ্য সহ ফাইল তৈরি করা হয়েছিল। এক প্রাক্তন সিআইএ গোয়েন্দা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, এটা অনেকটা ‘পাজল’ সাজানোর মতো। টুকরো টুকরো তথ্য জুড়ে আস্ত ছবি বানানো হয়। খামেনেই কী খান, তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোথায় বাড়ির ময়লা ফেলেন- এই সব তথ্যও ফাইলে উল্লেখ করা হয়।
এখন প্রশ্ন হল, CIA ও মোসাদ কীভাবে জানল, যে এতজন শীর্ষ ইরানি নেতা শনিবারই এক জায়গায় জড়ো হচ্ছেন? সূত্রের খবর,
হামলায় সময় খামেনেই কমপ্লেক্সের একটি বিল্ডিংয়ে ছিলেন। ওই বিল্ডিংয়েরই আরেক অংশে ছিলেন ইরানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী-সহ বাকিরা। মোসাদ গতবছর যুদ্ধের সময় থেকেই খামেনেইকে হত্যার ছক কষলেও খুঁটিনাটি তথ্য যে ইজরায়েলের কাছে ছিল না, সেটা স্পষ্ট। CIA এই তথ্য ইজরায়েলের সঙ্গে ভাগ করে নিতেই নেতানিয়াহু আর দেরি করেননি। চিরশত্রুকে চিরঘুমে পাঠাতে ১৪০টি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমানকে পাঠান তেহরানে। ৩০টি বাঙ্কার বাস্টার বোমা ফেলা হয় খামেনেই-এর বাসভবন ও দপ্তরে। খামেনেই সে সময় তাঁর ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। ইজরায়েলি বোমাবর্ষণে খামেনেই, ইরানি প্রতিরক্ষামন্ত্রী-সহ খামেনেই-এর মেয়ে, জামাই, নাতি ও নাতনিরও মৃত্যু হয়। খামেনেই মারা যাওয়ার পর তাঁর দেহের ছবি ইরানের আগে ইজরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। ইজরায়েল ভেবেছিল, ইরানি বায়ুসেনা বা ডিফেন্স সিস্টেম বোধহয় প্রত্যাঘাত করবে। কিন্তু খামেনেই মাত্র ৬০ সেকেন্ডে নিকেশ করে ইজরায়েলি বায়ুসেনা ফের তেল আভিভে ফেরত না আসা পর্যন্ত তেহরান টের-ই পায়নি যে খামেনেই মারা গেছেন। খামেনেই-এর মৃত্যুকে ট্রাম্প এযুগের সবচেয়ে ঘৃণ্য দানবের মৃত্যু বলেছেন। ইরানি প্রেসিডেন্ট এই হত্যাকে যুদ্ধ অপরাধ বলে উল্লেখ করেছেন। IRGC জানিয়েছে, এই হত্যার উপযুক্ত বদলা নেওয়া হবে যথাসময়ে। অভিযানে খামেনেইয়ের উত্তরসূরী বলে পরিচিত মোজতবা খামেনেই-ও মারা গেছেন বলে দাবি ইজরায়েলি সেনার।