AQI
Sign In

By signing in or creating an account, you agree with Associated Broadcasting Company's Terms & Conditions and Privacy Policy.

EXPLAINED: এক সপ্তাহ পর আমূল বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ?

EXPLAINED: ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট শেখ হাসিনাকে হঠিয়ে তথাকথিত বর্ষা বিপ্লবের বিজয় পতাকা উড়ল। সেই বিপ্লবেরই বাই প্রোডাক্ট এই গণভোট। তথাকথিত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অগুনতি মুখ ধীরে ধীরে আবছা হতে থাকল। আর ফোকাসে এলেন হাসনত, সারজিস, মাহফুজ, নাহিদ, পাটোয়ারি মায় গোটা জামাত-শিবির - আর সুদূর থেকে পিনাকী-ইলিয়াস-কনকরা। সরকারের মুখ হলেন মহম্মদ ইউনূস। সেই থেকেই তাঁরা চাইতে থাকলেন, সংস্কার। ভোট না সংস্কার, এই প্রশ্নে মুখরিত হতে থাকল বাংলার মাটি বাংলার জল।

EXPLAINED: এক সপ্তাহ পর আমূল বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশ?
কী হতে চলেছে বাংলাদেশে?Image Credit: TV9 Bangla
| Edited By: | Updated on: Feb 06, 2026 | 7:09 PM
Share

আর ঠিক এক সপ্তাহ। তারপরই পুরোটা পরিষ্কার হবে। কিন্তু,পরিষ্কার কি আদৌ হবে, নাকি আরও অনেকটা ঘোলাটে হবে? আমূল বদলে যাবে বাংলাদেশ? বিষয়টা নিঃসন্দেহে নির্ণায়ক। তাই আজ থেকে আর হপ্তা খানেক পরে হতে চলা বাংলাদেশের ভোট ও ভোটের ফলে সে দেশের বাইরে সব থেকে বেশি যাদের প্রভাবিত করতে পারে, সেই পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারত থেকে একরাশ প্রশ্ন, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ক্রমশ প্রকট হচ্ছে।

একুশে ফেব্রুয়ারির দেশে এবার ১২ ফেব্রুয়ারি আক্ষরিক অর্থেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ১২ তারিখে বাংলাদেশে জোড়া ভোট। মানে, একই সঙ্গে গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনটা আমাদের কাছে যেমন অনেক বেশি চেনা ব্যাপার, আপামোর বাংলাদেশবাসীর কাছেও তাই। তাই নতুন করে যাবতীয় গোল বেঁধেছে তা ওই গণভোটকে নিয়ে। কেউ বলছেন, এই গণভোটটাই মাস্টারস্ট্রোক। আবার কারও মতে গণভোট টোট করে আদতে কিস্যু হবে না…যা চলছিল তাই চলবে।

আসলে, বাংলাদেশ যে এই প্রথম গণভোট দেখবে তা তো নয়। এর আগে আরও তিন তিন বার গণভোট বা রেফারেন্ডাম দেখেছ ওপার বাংলা। আর সব বারই বিপুল সংখ্যক ‘হ্যাঁ ভোট’ দিয়েছেন সেদেশের নাগরিকরা। তবে সাতাত্তরে জিয়াউর রহমানের বা পঁচাশিতে এরশাদের আমলের গণভোট কিংবা একানব্বই সালে খালেদাজিয়া জমানার গণভোটের সঙ্গে এবারের পরিস্থিতির কোনও মিলই নেই।

দেখুন, প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বা প্রেসিডেন্ট এরশাদ মূলত তাঁদের শাসনকার্যের নীতি-কর্মসূচির বৈধতা যাচাই করতে গণভোট আয়োজন করেছিলেন। যা প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম অব গভমেন্টে ক্ষমতায় টিকে থাকার একটা কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং ম্যানডেট ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

আর এরশাদের পতন ঘটিয়ে খালেদা ক্ষমতায় এসে তার আগে ১৬ বছরের রাষ্ট্রপতিশাসিত শাসন থেকে প্রধানমন্ত্রীশাসিত সংসদীয় পদ্ধতি তৈরির জন্য বিল এনেছিলেন। আর তাতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সই করবেন কি না তা জানতেই একানব্বই সালের গণভোট হয়েছিল এবং রীতি মেনে হ্যাঁ ভোটের পাল্লাই ভারী ছিল।

কিন্তু, এবার? ২০২৪ সালের ৫ অগস্ট শেখ হাসিনাকে হঠিয়ে তথাকথিত বর্ষা বিপ্লবের বিজয় পতাকা উড়ল। সেই বিপ্লবেরই বাই প্রোডাক্ট এই গণভোট। তথাকথিত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের অগুনতি মুখ ধীরে ধীরে আবছা হতে থাকল। আর ফোকাসে এলেন হাসনত, সারজিস, মাহফুজ, নাহিদ, পাটোয়ারি মায় গোটা জামাত-শিবির – আর সুদূর থেকে পিনাকী-ইলিয়াস-কনকরা। সরকারের মুখ হলেন মহম্মদ ইউনূস। সেই থেকেই তাঁরা চাইতে থাকলেন, সংস্কার। ভোট না সংস্কার, এই প্রশ্নে মুখরিত হতে থাকল বাংলার মাটি বাংলার জল।

বর্ষা বিপ্লবীদের কথায়, স্বৈরাচারী হাসিনা বাংলাদেশের প্রত্যেকটা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে নষ্ট করে কায়েমি স্বার্থ গুছিয়েছিলেন। তাই রাষ্ট্রকাঠামো এবং বাহাত্তরের সংবিধান তারা উপড়ে ফেলে দিতে চান। কিন্তু কাজটা যে খুব সহজ নয় সেটা বুঝেই সংস্কার করতে হবে বলে গোঁ ধরলেন।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় সে দেশের সব থেকে বড় দল বিএনপি তখন থেকেই নাগাড়ে চেয়ে আসছে নির্বাচন। কারণ, তাঁরা জানতেন যে ভোট হলে জিতবেন তাঁরাই। আর এটা শুধু যে বিনএনপি জানত তা নয়, আসলে জানত সবাই। ঠিক সেই জন্যই ইউনূস সরকারের ভোট পিছতে নানা টালবাহানা। এমনকী, ঐক্যমত্য কমিশন নামে একটা কমিশন গড়ে সবপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জুলাই সনদ তৈরি করা হল। আর বলা হল, এই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোট করে তারপর জাতীয় সরকার নির্বাচন।

বিএনপি এখানেই বেঁকে বসল। কারণ, তাঁরা বেশ বুঝতে পেরেছিলেন যে একবার এই গণভোটে হ্যাঁ ভোট জিতে গেলে দেশের শাসন ক্ষমতা চলে যেতে পারে তথাকথিত বর্ষাবিপ্লবী ও তাদের সিমপ্যাথাইজার বা পৃষ্ঠপোষকদের হাতে। সেখান থেকেই দড়ি টানাটানিটা চলতে থাকল। দু পক্ষই নাছোড়। অবশেষে ঠিক হল, একই দিনে জোড়া ভোট। গণভোট এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

আচ্ছা, ধরুন বাংলাদেশের ট্রেন্ড অনুযায়ী এবারের রেফারেন্ডামেও হ্যাঁ ভোট জিতল অকাতরে। তারপর? সনদ বলছে, নতুন যাঁরা এম.পি. নির্বাচিত হবেন তাদের একাংশকে নিয়েই তৈরি হবে সংবিধান সংশোধন পরিষদ। আর সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ২৭০ দিন, মানে নয় মাসের মধ্যে যদি সংস্কার সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে গণভোটে অনুমোদিত সংবিধান সংস্কার বিলটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হবে।

তা জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে ঠিক কী কী বদলে যাবে বাংলাদেশে?

  • এটা আলোচনা করব, কিন্তু দুটো ভাগে। প্রথমে বলব, সেই সব বিষয়গুলি যাতে বিএনপি বা জামাত কারও কোনও আপত্তি নেই।
  • প্রথমত, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে সরকার সংবিধান সংস্কারে বাধ্য থাকবে।
  • দ্বিতীয়ত, সংসদ হবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট, ঠিক ভারতের মতো।
  • তৃতীয়ত, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার পাকাপাকিভাবে ফিরে আসবে।
  • চতুর্থত, বিরোধী দলের ক্ষমতা বাড়বে, ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকেই আসবেন।
  • এমপিরা বাজেট ও আস্থাভোট ছাড়া দলীয় লাইনের বাইরে ভোট দিতে পারবেন।
  • বিচার বিভাগ প্রশাসনিক প্রভাব থেকে মুক্ত হবে।
  • ইন্টারনেট ও তথ্য সুরক্ষা হবে মৌলিক অধিকার।
  • রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তিতে সংসদের অনুমোদন লাগবে।

এবার আসি আসল জায়গায় যা নিয়ে বিভিন্ন দলের আপত্তি আছে।

  • এক, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে বিএনপির আপত্তি আছে।
  • দুই, প্রধানমন্ত্রীর পদে কোনও ব্যক্তির মোট কার্যকাল ১০ বছরে বেঁধে দেওয়াতেও সায় নেই বিএনপি-র।
  • তাছাড়া, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকা নিষিদ্ধ করাতেও আপত্তি আছে তারেক রহমানের দলের।
  • তিন, নির্বাচন কমিশন, দুদক, ন্যায়পাল নিয়োগে বহুপক্ষীয় কমিটিতেও আপত্তি আছে।
  • চার, সংবিধানের মূলনীতির পরিবর্তন নিয়েও অস্বস্তি আছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় আপত্তিটা হল মোট ৮৪টি সংস্কার একসঙ্গে বাধ্যতামূলক করা নিয়ে। এখানেই প্রশ্নটা সবচেয়ে ধারালো হচ্ছে। কারণ, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জিতলে, এই সব সংস্কার বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে সেই রাজনৈতিক দলগুলোর হাতেই— যারা নিজেরাই আপত্তি তুলেছে এর অনেকগুলি প্রস্তাব নিয়ে। বিতর্ক তৈরি হচ্ছে আরও একটা বিষয় নিয়ে।

যে কোনও গণভোটে সরকারের ভূমিকা হওয়া উচিত নিরপেক্ষ। অনেকটা নিউট্রাল আরবিট্রেটরের মতো। কিন্তু, এখানে ইউনূস সরকার সরাসরি ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে যেভাবে সরকারি অর্থে প্রবল প্রচার চালাচ্ছে তাতে প্রশ্ন উঠছে তাঁদের স্বার্থ নিয়ে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তো অরাজনৈতিক। পার্লামেন্ট ভোট হয়ে গেলেই তো তারা বিদায় নেবেন। তাহলে, গণভোটে হ্যাঁ ভোটকে জিতিয়ে যাবতীয় সংস্কার বাস্তবায়িত করার জন্য ইউনূস কেন এতটা উৎসাহী?

মুখে তিনি অনেক ভালো ভালো কথা বলছেন। কিন্তু বিগত সাতেরো মাসের অভিজ্ঞতা তো অন্যরকম…। সবার অলক্ষে ভেতর ভেতর কি তাহলে অন্য কোনও ছক তৈরি হচ্ছে?

তাছাড়া, গণভোট আইন তৈরির জনাদেশ দিতে পারে। কিন্তু সেই আইনকে জীবন দেয় রাজনীতি। তাই শেষ পর্যন্ত এই সংস্কারগুলো দিনের আলো দেখবে, না ক্ষমতার অন্ধকারে হারিয়ে যাবে—সেটাই নির্ণায়ক প্রশ্ন।