
ওয়াশিংটন: আমেরিকায় এখন বইছে বদলের হাওয়া। মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে ট্রাম্পের দল। সেনেট ও হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ- দুই কক্ষেরই দখল নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এবার আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, লস অ্যাঞ্জেলেসেও বড় রাজনৈতিক পালাবদল। বর্তমান মেয়র ক্যারেন বাসকে হারিয়ে মেয়র নির্বাচনে বিরাট জয় পেলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নিত্যা রমন। ৪৫ বছরের নিত্যা রমন ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সমর্থন পেয়েছিলেন। তাঁর এই জয় মার্কিন রাজনীতিতে ডেমোক্র্যাটিক নেতাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ইঙ্গিত বলেই মনে করা হচ্ছে।
আমেরিকায় মেয়র পদে দক্ষিণ এশীয় ব্যক্তি? এক বছর আগেও এটা অসম্ভব ছিল। তবে জোহরান মামদানি সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন। নিউইয়র্কের মেয়র হয়েছেন তিনি। এবার নজির গড়লেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নিত্যা রমন। লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচিত হলেন তিনি।
লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র নির্বাচনে নিত্যা রমন শহরের নাগরিক পরিষেবা উন্নত করা, গৃহহীন মানুষের সমস্যা মোকাবিলা এবং পুলিশ ব্যবস্থায় সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রচার করেছিলেন। দলের প্রচলিত নেতৃত্বের বাইরে গিয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্যও পরিচিতি পেয়েছেন তিনি।
কেরলে শিকড় নিত্যা রমনের। তাঁর জন্ম কেরলের ত্রিশূরে। মা-বাবা এখানেই কাজ করতেন, তাই কিছুটা বেড়ে ওঠাও এই দেশে। বাবা উচ্চশিক্ষার জন্য আমেরিকায় পাড়ি দেওয়ায় মাত্র ছয় বছর বয়সে ভারত ছাড়তে হয় নিত্যাকেও। তবে এখনও তিনি মালয়লম ভাষা স্পষ্ট বোঝেন। ২০১৯ সালেও বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কেরলে এসেছিলেন নিত্যা।
নিত্যার মেয়র পদে লড়াইও প্রথম থেকে নিশ্চিত ছিল না। বরং শুরুতে তিনি বর্তমান মেয়র ক্যারেন বাসকেই সমর্থন করেছিলেন। একসময় দু’জন রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠও ছিলেন। কিন্তু মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময়ের ঠিক আগে রমন নিজেই প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা করেন। তাঁর দাবি ছিল, লস অ্যাঞ্জেলেস এখন এমন এক পরিস্থিতিতে পৌঁছেছে, যেখানে পরিবর্তন জরুরি।
শেষ পর্যন্ত সেই লড়াইয়ে প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিলেন রমন। ফল প্রকাশের পর পরাজয় মেনে নিয়ে ক্যারেন বাস জানান, তিনি রমনকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বলেন, “ফলাফল প্রত্যাশামতো হয়নি। তবে লস অ্যাঞ্জেলেসের মানুষ তাঁদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর যাতে সুষ্ঠুভাবে হয়, তা নিশ্চিত করতে কাজ করব।”
ক্যারেন বাসের এই পরাজয়ও লস অ্যাঞ্জেলেসের রাজনীতিতে নজিরবিহীন। গত দুই দশকে তিনিই প্রথম মেয়র, যিনি পুনর্নির্বাচনে হেরে গেলেন। তাঁর প্রথম মেয়াদ চলাকালীন ভয়াবহ পালিসেডস অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সেই সময় মেয়র বিদেশে ছিলেন এবং শহরের দমকল বিভাগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত ছিল না বলে অভিযোগ ওঠে। আগুনে বহু বাড়ি ধ্বংস হয় এবং বহু মানুষ ঘরছাড়া হন। এই ঘটনার মোকাবিলা নিয়ে মেয়রের বিরুদ্ধে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল সাধারণ মানুষের একাংশের মধ্যে।
লস অ্যাঞ্জেলেসে দীর্ঘদিনের অন্যতম বড় সমস্যা গৃহহীন মানুষের সংখ্যা। এই সমস্যা মোকাবিলায় বর্তমান মেয়রের নীতির সমালোচনা করে নিত্যা রমন নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। প্রচার ও নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে তিনি জানিয়েছেন, রাস্তায় থাকা মানুষের কাছে চিকিৎসা পরিষেবা পৌঁছে দিতে আরও মেডিক্যাল আউটরিচ টিম তৈরি করা হবে। তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি করে ধীরে ধীরে স্থায়ী আবাসনে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া গৃহহীন মানুষদের থাকার জন্য হোটেলের উপর নির্ভরতা কমিয়ে, আরও বেশি বাড়ি ও আবাসনের ব্যবস্থা করার কথাও বলেছেন তিনি।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত নতুন মেয়রের দাবি, তাঁর পরিকল্পনা কার্যকর হলে ২০২৮ সালের মধ্যে রাস্তায় তাঁবু বা অস্থায়ী ক্যাম্পে থাকা মানুষের সংখ্যা অন্তত অর্ধেক কমানো সম্ভব। প্রসঙ্গত, ওই বছরই লস অ্যাঞ্জেলেসে অলিম্পিক আয়োজন হওয়ার কথা।
শুধু গৃহহীন সমস্যা নয়, এছাড়া শহরের ভাঙাচোরা রাস্তা, নষ্ট ফুটপাত এবং কাজ না করা স্ট্রিটলাইটের মতো নাগরিক সমস্যাগুলিও দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। পুলিশ ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের কথা বলেছেন রমন। ফেডারেল অভিবাসন কর্তৃপক্ষের প্রতি অতিরিক্ত সহানুভূতিশীল বলে মনে করা পুলিশ প্রধানকে সরানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি।