
নয়া দিল্লি: ২০২৪ সালে ৫ অগস্ট। ফুঁসে উঠল বাংলাদেশের জনগণ। এতদিন ধরে ঢাকার রাজপথে যে আন্দোলন হচ্ছিল, তা গণভবনেও পৌঁছে গেল। দরজা খুলে ঢুকল উন্মত্ত জনতা। তোলপাড় করে দিল সব। দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাড়ি থেকে শাড়ি থেকে শুরু করে পুকুরের মাছ- হাতের কাছে যা পেল, তা-ই লুট করে নিয়ে গেল। ক্ষমতাচ্যুত হলেন হাসিনা, ছাড়লেন দেশ। বিগত দেড় বছরে বাংলাদেশে অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে। এই পরিবর্তন নিয়ে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সময় যে আদর্শ ও চরিত্র ছিল, তা এখন হারিয়ে ফেলেছে এবং পাকিস্তানের মতো একটি মডেলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পাকিস্তান মডেল ঠিক কী? তার ব্যাখ্যা করলেন হাসিনা নিজেই।
এনডিটিভি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “আমি কখনওই কোনও দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে আপত্তি করিনি। দেশের মানুষের জন্য বাংলাদেশ সব দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখে। আমাদের বিদেশ নীতি সবসময়ই স্পষ্ট ছিল, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারোর সঙ্গে বিদ্বেষ নয়। তবে সেই সম্পর্ক রাষ্ট্রের নীতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আদর্শকে অক্ষুণ্ণ রেখে বজায় রাখতে হবে।”
তাঁর সরকারের পতনের পরই পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সখ্যতা বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেশের স্বাধীনতার ইতিহাস মনে করান হাসিনা। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ মিলিটারি শাসন, বিদ্বেষ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও গণতন্ত্র অস্বীকারের লড়াই থেকে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে দেশ তৈরি করেছিলাম, তা জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। এই কাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়ার অর্থ হল বাংলাদেশের পরিচিতিতেই আঘাত করা।”
কেমন বদলে গিয়েছে বাংলাদেশ? হাসিনা বলেন, “৫ অগস্টের পর মুক্তিযুদ্ধের চেতনার উপরই হামলা করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতোর মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। দেশজুড়ে মুক্তি যুদ্ধের স্মৃতিসৌধ ভেঙে ফেলা হয়েছে। জয় বাংলা স্লোগানকে অপরাধ বলে গণ্য করা হয়। জাতির পিতার বাসভবনে বারংবার হামলা করা হয়েছে। সংখ্য়ালঘু সম্প্রদায়দের উপরে হামলা করা হচ্ছে। মন্দির ভেঙে ফেলা হচ্ছে। সুফি কেন্দ্র ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলির উপরে হামলা করা হয়েছে। সন্ত্রাসদমন কার্যকলাপ দুর্বল হয়ে গিয়েছে, উগ্রপন্থীদের জন্য জায়গা করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব ধরনের আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে।”
সেখানেই আওয়ামী লিগ যখন সরকারে ছিল, তখন আমরা স্থিতিশীল, আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ গড়েছিলেন তিনি। অগ্রগতির এক অনন্য উদাহরণ ছিল। এমনটাই দাবি। হাসিনা এর সপক্ষে যুক্তিও দেন। বলেন, “২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি গ্রোথ ৭.২৫ শতাংশ ছিল। পার ক্যাপিটা আয় পৌঁছেছিল ২,৭৯৩ মার্কিন ডলারে। একই সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়, যা আগের অবস্থান থেকে ২৯ ধাপ এগিয়ে যাওয়ার নজির ছিল।”
হাসিনা বলেন, “আওয়ামী লিগ সরকারের আমলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩২.০৫ শতাংশে এবং প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) পাঁচ গুণ বেড়ে ৩.৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছায়।”
দারিদ্র্যতা ঘোচানোর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। বলেন, “দারিদ্র্যের হার কমিয়ে ১৮.৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছিল। খাদ্যশস্য উৎপাদন চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল, একই সঙ্গে শিশুমৃত্যুর হারও চার গুণ হ্রাস পেয়েছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আট গুণ বাড়ানো হয়েছিল। দেশের একশো ভাগ জনগণকেই বিদ্যুৎ পরিষেবার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল।”
শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও আওয়ামী লিগ সরকারের সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সাক্ষরতার হার ৭৮.৫ শতাংশ হয়েছিল। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারা দেশে ১৪ হাজার ৯৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল।”
ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের পুনর্বাসনের বিষয়টি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “সম্মানের সঙ্গে তাদের পুনর্বাসন করা হয়েছিল। প্রায় ৪২ লাখ ৮০ হাজার ১১৫ জন মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ২০০ জমিসহ বাড়ির মালিকানা দেওয়া হয়েছিল। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নয়নের বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে যে, বাঙালি জাতি সুযোগ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সৎ নেতৃত্ব পেলে নিজেদের শক্তিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম”।
তবে গত ৫ আগস্টের পর দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধ্বংস করা হয়েছে এবং দেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন শেখ হাসিনা। তাঁর দাবি, এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে একমাত্র আওয়ামী লিগই সক্ষম এবং জনগণও তা উপলব্ধি করেছে।
তিনি আরও বলেন, “অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে আওয়ামী লিগ জয়ী হত। এ কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার এবং বাংলাদেশ-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি আওয়ামী লিগের সাংগঠনিক শক্তিকে ভয় পায়। এই কারণেই সরকার সচেতনভাবেই আওয়ামী লিগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, দলটিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য ধ্বংস করেছে।”
শেখ হাসিনার ভাষায়, “৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে যে ব্যর্থ রাষ্ট্রের মডেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটিই আজ দেশের বাস্তবতা।”