
একদিকে আমেরিকা-ইজরায়েল, অন্যদিকে ইরান, সঙ্গে হেজবোল্লাহ-হাউথি বিদ্রোহিরা। জলে-স্থলে-আকাশে ধুন্ধুমার লড়াই চলছে দুপক্ষের। আকাশপথে লড়াই চালাচ্ছে মার্কিন রিপার ড্রোন বনাম ইরানের শাহিদ ড্রোন। একবার ইরানি ড্রোন দুবাইয়ের বহুতলে আছড়ে পড়ছে, তো পর মুহূর্তেই মার্কিন লুকাস ড্রোন ‘সোয়ার্ম’ বা ঝাঁকে ঝাঁকে অ্যাটাক করছে তেহরানের মিলিটারি কমপ্লেক্সে। সবচেয়ে কম খরচে শত্রুকে রক্তাক্ত করতে ড্রোন যুদ্ধ এখন জলভাত। সে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধই হোক বা অপারেশন সিঁদুর! কিন্তু ইরানকে এই আধুনা ড্রোনযুদ্ধ শেখাল কে? কীভাবে ইরান হয়ে উঠল কমদামি অথচ ঘাতক ড্রোনের আঁতুরঘর? সেটা জানতে হলে পিছিয়ে যেতে হবে প্রায় বিশ বছর আগে।
২০০৭-এ আফগানিস্তানের কান্দাহারে খানিকটা ঝাপসা, লেজ-হীন, অনেকটা বাদুড়ের মতো দেখতে ছোট উড়ন্ত বস্তু প্রথম দেখল এই বিশ্ব। তখনও আমেরিকা এর অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। যাঁরা প্রতিরক্ষার খবর রাখতেন, তাঁরা এই উড়ন্ত বস্তুর নাম দিলেন ‘বিস্ট অফ কান্দাহার’। প্রায়দিনই রাতের অন্ধকারে আফগানিস্তানের দক্ষিণে নিঃশব্দে কালো আকাশে মিলিয়ে যেত এয়ারক্রাফট RQ-170 Sentinel… যুদ্ধেক্ষেত্রে ব্যবহৃত প্রথম মার্কিন নজরদারি ড্রোন। মার্কিন অস্ত্র প্রস্তুতকারক সংস্থা লকহিড মার্টিনের বানানো স্টেলথ সার্ভেলিয়েন্স ড্রোন। ৯/১১-র পর কান্দাহারের এয়ারফিল্ড থেকে মার্কিন সেনার অপারেটর-দের এই ড্রোন বহু CIA অপারেশনের আগে খুঁটিনাটি তথ্য জোগাড় করে এনে দিত। আফগান সীমান্ত পেরিয়ে ইরানে চুপিসারে ঢুকে, সেনা ঘাঁটির ছবি তুলে আনত এই ড্রোন। নিঃশব্দে। ধরা না পড়ে। কিন্তু সব কিছুরই একটা শেষ থাকে। ২০১১-য় CIA-র পর্দাফাঁস হয়ে গেল। আজকের ড্রোন যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল যে মার্কিন ড্রোন, সেই RQ-170 Sentinel মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে ফিরে আসার বদলে আফগান সীমান্ত থেকে ২২৫ কিলোমিটার ভিতরে ইরানের কাশমারে ভেঙে পড়ল। আর সেই প্রথম ইরানি সেনা ও গোয়েন্দারা রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনোলজি ব্যবহার করে পাল্টা ড্রোন যুদ্ধের প্রস্তুতি শুরু করল। আজ মারণ ড্রোন তৈরির ইঁদুর দৌড় শুরু হয়েছিল ৪ ডিসেম্বর, ২০১১।
আমেরিকা কিন্তু সেদিন প্রথমে স্বীকার করেনি যে লকহিড মার্টিনের সেন্টিনেল ড্রোন CIA-ই ইরানে পাঠিয়েছিল। পেন্টাগন শুধু জানায়, নজরদারির কাজে ব্যবহৃত একটি ড্রোন ইরান সীমান্তের কাছে উধাও হয়ে গেছে। কিন্তু ইরানি নেতা ও ইরানের ইসলামিক গার্ড কোর তখন রক্তের স্বাদ পেয়ে গেছে। জাতীয় টিভিতে ইরানি সেনা দেখাল, কীভাবে এক বিশেষ ধরণের ইলেক্ট্রনিক সিস্টেম ব্যবহার করে তারা মার্কিন ড্রোনটির ন্যাভিগেশন সিগন্যালকে অচল করে দিয়েছিল। তেহরান দাবি করে, তাদের সাইবার ওয়ারফেয়ার ইউনিট ড্রোনটি হাইজ্যাক করেছে। পেন্টাগন অবশ্য সে যুক্তি মানেনি। তাদের যুক্তি ছিল, ড্রোনটি চালক বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে পথ ভুলে ইরান সীমান্তে ভেঙে পড়ে। দাবি-পাল্টা দাবি তো থাকবেই! কিন্তু সেন্টিনেল ড্রোন গোটা বিশ্বকে দেখিয়েছিল, সীমান্ত না পেরিয়ে, সেনা না পাঠিয়েও কীভাবে শত্রু দেশের সেনা ঘাঁটির নিখুঁত ও হাই কোয়ালিটি ছবি তুলে আনা যায়। ২০১১-তে ওসামা বিন লাদেনকে খতম করতে মার্কিন সেনা ও CIA এই RQ-170 ড্রোন-ই ব্যবহার করে। পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে আল কায়দা নেতার গোপন ঘাঁটির উপরে লাগাতার নজর রাখছিল লকহিড মার্টিনের বানানো এই ড্রোন। এই ড্রোন তারপরেও প্রায় ২ দশক ধরে মার্কিন সেনা ব্যবহার করেছে। আজকের বি-টু বম্বারের ধাঁচে বানানো এই ড্রোনের ওপরের অংশে তখন এক বিশেষ ধরণের কোটিং দেওয়া হত রেডার সিগন্যাল থেকে বাঁচার জন্য। এমনকী ওবামার মতো মার্কিন প্রেসিডেন্টকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য রাতে তাঁর বাসভবনের মাথার উপরে এই ড্রোন ওড়াত CIA। ইরানে যে ড্রোন ভেঙে পরে ওবামা পরে সেটি ফেরতও চেয়েছিলেন আনুষ্ঠানিকভাবে। কিন্তু স্বাভাবিক কারণেই তেহরান সে দাবি মানেনি। বরং ফের টিভিতে ইরানি সেনা দাবি করে, খেলনা ড্রোন চাইলে ওবামা পেতে পারেন। মার্কিন গোয়েন্দাদের বিশ্বাস, ইরানি বৈজ্ঞানিকরা ওই মার্কিন ড্রোনকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে, প্রতিটি অংশকে বিশ্লেষণ করে পাল্টা ড্রোন তৈরিতে ব্যবহার করে। আজকের ইরানের শাহিদ-১৭১ বা সাইঘে-র মতো ছোট কম দামি ড্রোন মার্কিন প্রযুক্তি ব্যবহার করেই তৈরি। CIA-র এটাও অনুমান, রাশিয়া একাজে সাহায্য না করলে যে ইরান ট্রাক্টর বানাতে পারে না, তারা কখনই আজকের ড্রোন সুপার পাওয়ার হতে পারত না।
তবে ‘বিস্ট অফ কান্দাহার’ একধাক্কায় ইতিহাসের বেশ কয়েকটি অধ্যায়কে সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
এই ইতিহাসের পর একটাই প্রশ্ন সামনে আসে, ড্রোন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ কোথায়? আজ যুদ্ধ মানেই শুধু ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান বা হাজার হাজার সৈন্য নয়। কয়েক হাজার ডলার খরচের ছোট একটি ড্রোনও বদলে দিতে পারে যুদ্ধের সমীকরণ। কখনও কখনও ইতিহাস বদলে দিতে একটি ড্রোনই যথেষ্ট।