
নয়া দিল্লি: আইনের ডিগ্রি, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও এক সময়ে তাঁর বিচারকদের কক্ষে ঢোকা বারণ ছিল। কারণ, তাঁর গায়ের রঙ ফর্সা নয়। এই বর্ণ বিদ্বেষকে গায়ে মাখেননি নাভানেথেম নভি পিল্লাই। প্রভাব পড়তে দেননি তাঁর কেরিয়ারে। অদম্য শক্তি নিয়ে লড়াই চালিয়ে যান। সাউথ আফ্রিকা হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা বিচারপতি হন তিনি। আজ, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাভানেথেম নভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার পেলেন। শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রচারের জন্য তাঁকে এই সম্মানে সম্মানিত করা হয়েছে।
তামিলনাড়ুর ভাল্লালার সম্প্রদায়ে শিকড়। তবে ভারতে জন্মাননি পিল্লাই। ১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে জন্ম হয় নভি পিল্লাইয়ের। সেই সময়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ষবিদ্বেষ চরমে। সেখানে বর্ণবৈষম্যমূলক ব্যবস্থা বা অ্যাপার্টহাইড (Apartheid System) চালু ছিল। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের গায়ের রং ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য করা হত।
রাষ্ট্রপুঞ্জকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিল্লাই বলেছিলেন, “আমরা খুব গরিব ছিলাম। আমার বাবা বাস চালাতেন। আমরা ছিলাম সাত ভাইবোন। আমার একটা অভিজ্ঞতার কথা বলি, কারণ অনেকেই মনে করেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষরা আফ্রিকানদের তুলনায় ভালো থাকেন। কিন্তু বাস্তবে আমরা সবাই গরিব ছিলাম এবং একসঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করতাম।”
তবে জীবনের এই কঠিন অভিজ্ঞতাগুলিকে তিনি সার্থক বলেই মনে করেন। কারণ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে পেরেছিলেন তিনি। ছোটবেলার অভিজ্ঞতা থেকেই পিল্লাই বিশ্বাস করতে শুরু করেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত জরুরি।
পিল্লাই নাটাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৬৩ সালে তিনি স্নাতক ডিগ্রি এবং ১৯৬৫ সালে আইনের স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে আমেরিকার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৮৮ সালে সেখান থেকেই আইনে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
১৯৬৭ সালে নাটাল অঞ্চলে, যা বর্তমানে কোয়াজুলু-নাটাল নামে পরিচিত, প্রথম মহিলা হিসেবে নিজের আইনজীবীর চেম্বার প্রতিষ্ঠা করেন পিল্লাই। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা বিচারপতি হিসাবেও নিযুক্ত হন তিনি।
তাঁর কর্মজীবনের শুরুর দিকের অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাঁর কাজের ভিত্তি তৈরি করে। ক্ষমতাশালী প্রতিষ্ঠানগুলিকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং নির্যাতনের শিকার মানুষের অভিজ্ঞতা যাতে আইনি প্রক্রিয়ায় উপেক্ষিত না হয়, তা নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর কাজের অন্যতম লক্ষ্য।
১৯৯৫ সালে পিল্লাই রাষ্ট্রপুঞ্জের অধীনে গঠিত রুয়ান্ডার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (ICTR) বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৯৯৪ সালে রোয়ান্ডায় সংঘটিত গণহত্যা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের জন্য এই ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছিল। ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত দুই দফায় ট্রাইব্যুনালের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
এই ট্রাইব্যুনালে তাঁর অংশগ্রহণ করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মামলাটি ছিল রোয়ান্ডার তাবা অঞ্চলের প্রাক্তন মেয়র জ্যঁ-পল আকায়েসুর বিরুদ্ধে। ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে এক ঐতিহাসিক রায়ে ট্রাইব্যুনাল আকায়েসুকে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে।
এই মামলাটি আরও একটি কারণে ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়। ট্রাইব্যুনাল জানিয়েছিল, কোনও সুরক্ষিত জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে ধর্ষণ ও যৌন হিংসা চালানো হলে, তা গণহত্যার অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
গণহত্যা, যৌন হিংসা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থার বিকাশে পিল্লাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। তাঁর কাজের মাধ্যমে এই নীতিও প্রতিষ্ঠিত হয় যে সরকারি ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিরাও গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য ব্যক্তিগতভাবে ফৌজদারি বিচারের মুখোমুখি হতে পারেন।
২০০৩ সালে পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) বিচারপতি নির্বাচিত হন। গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং নির্দিষ্ট শর্তে আগ্রাসনের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের জন্য এই স্থায়ী আদালত গঠিত হয়েছে।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ পরিষদ তাঁকে নিয়োগ করার পর পিল্লাই রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি এই পদে ছিলেন। এই পদে থাকাকালীন তিনি রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দফতর (OHCHR)-এর নেতৃত্ব দেন। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার রক্ষা ও প্রসারের কাজ করে এই সংস্থা। তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ছিল রাষ্ট্রের জবাবদিহি, বৈষম্য, নাগরিক স্বাধীনতা, সংঘাত এবং দুর্বল ও বিপন্ন জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে কাজ করা।
হাইকমিশনার হিসেবে পিল্লাই সকল মানুষের জন্য সমানভাবে মানবাধিকার নিশ্চিত করার পক্ষে সওয়াল করেন। পাশাপাশি, যাঁরা মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করেন, তাঁদের নিরাপত্তা এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় দোষীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করার উপরেও জোর দেন।
২০১৪ সালে তাঁর এই দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়। তবে আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর কাজ পরবর্তী সময়েও ন্যায়বিচার ও অপরাধের দায়বদ্ধতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছে।