
ইরানে আরও মার্কিন সেনা, রণতরী ও যুদ্ধবিমান পাঠাচ্ছেন ট্রাম্প। আট বছর ২৮ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরাক যুদ্ধের খরচকে ট্রাম্প ছাপিয়ে যাবেন মাত্র এক মাসেই? দ্রুতই ইরান অভিযানের খরচ ছাপিয়ে যেতে চলেছে বুশের জমানার ইরাক যুদ্ধের খরচকে, অনুমান প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের।
ইরান ও তার আশেপাশে এখনই অন্তত ৫০ হাজার মার্কিন সেনা যুদ্ধের জন্য মোতায়েন করেছেন ট্রাম্প। রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তিনটি পরমাণু জ্বালানি চালিত এয়ারক্রাফট কেরিয়ার। অন্তত ২৫০টি যুদ্ধবিমান নিয়মিত উড়ছে, বোমাবর্ষণ করছে তেহরানে। মোতায়েন ৩০টি বড় মার্কিন রণতরী। বাহরিন, কাতার, কুয়েত, সৌদি, UAE–তে মার্কিন ঘাঁটিতে কর্মরত সেনার প্রতিদিনের থাকা খাওয়ার খরচের জেরে মার্কিন কোষাগারের নাভিশ্বাস উঠছে। আবার নতুন করে ২৫০০ জন স্পেশ্যাল ‘মেরিনস’ পাঠানোর সিদ্ধান্ত ট্রাম্পের। কারণ, কিছুতেই ইরানকে বাগে আনা যাচ্ছে না। ইরান যুদ্ধে প্রতিদিন আনুমানিক ৭০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের খরচ বইতে হচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসনকে। এইভাবেই চলতে থাকলে মার্চ শেষ হওয়ার আগেই ২০০৩-এর ইরাক যুদ্ধের খরচকেও ছাপিয়ে যাবে ইরান যুদ্ধের ব্যয়- অনুমান প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের।
ইরানের বিরুদ্ধে অপারেশন এপিক ফিউরি-তে বায়ুসেনা ও গোলাগুলির খরচ চালাতে মার্কিন কংগ্রেসের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলার বা ১৮ লক্ষ ৮০ হাজার কোটি টাকার অনুমোদন চেয়েছেন ট্রাম্প। মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, ট্রাম্প ‘কমান্ডার ইন চিফ’ হলেও যুদ্ধের অতিরিক্ত খরচের জন্য সর্বোচ্চ সাংবিধানিক মার্কিন কংগ্রেসের অনুমতি নিতে হয়। ট্রাম্প দুষ্টু লোকেদের মারতে এই টাকা চেয়েছেন বলে দাবি। এই প্রসঙ্গেই প্রাক্তন মার্কিন সেনাকর্তারা মনে করতে পারছেন, ইরাক যুদ্ধে ১ লক্ষ ৭০ হাজার মার্কিন সেনার রোজদিনের খরচের জন্য বুশ মার্কিন কংগ্রেসের কাছে সে সময় ৭৪.৭ বিলিয়ন ডলার চেয়েছিলেন। যা আজকের দিনের মূল্যবৃদ্ধির হিসাবে দাঁড়ায় ১৩৩ বিলিয়ন ডলার। ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার মোট খরচ ৩ ট্রিলিয়ন ডলার ছাপিয়ে গেছিল। অপারেশন এপিক ফিউরি-র প্রথম তিন হপ্তাতেই ট্রাম্প ২১ বিলিয়ন ডলারের খরচ। প্রতিদিনই এই খরচ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। একটা উদাহরণ দিলেই খরচের বহর বুঝতে পারবেন। এক একটা টোমাহক মিসাইল দাগতে খরচ হয় প্রায় ৪ মিলিয়ন ডলার। অভিযানের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত অন্তত ৭ হাজার এরকম মিসাইল আমেরিকায় ছুঁড়েছে। ফলে খরচের বহর বুঝতেই পারছেন। যুদ্ধের প্রথম দু দিনে গোলাগুলিতে ট্রাম্পের কোষাগার থেকে খরচ হয়েছে ৬ বিলিয়ন ডলার বা ৫৬ হাজার ৪০৬ কোটি টাকা।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বা CSIS-এর দাবি, শুধু গোলাগুলির জন্য আমেরিকার প্রতিদিনের খরচ ৮০০ মিলিয়ন ডলার। একটি এয়ারক্র্যাফট কেরিয়ারের শুধু প্রতিদিনের জ্বালানি খরচ ১৫ মিলিয়ন ডলার। এক একদিন মার্কিন যুদ্ধবিমান ওড়ানোর খরচ ৩০ মিলিয়ন ডলার। ইরানি হামলায় মার্কিন অস্ত্রাগারের ড্রোন, রেডারের ক্ষতি ২.৫ বিলিয়ন ডলার। বাকি ঘাঁটি নষ্টের খরচের কথা ছেড়েই দেওয়া হল। ইরানি হামলা ঠেকাতে এক একটি প্যাটট্রিয়ট মিসাইল ইন্টারসেপ্টরের খরচ ৪ মিলিয়ন ডলার। সবমিলিয়ে যুদ্ধের প্রথম ছয় দিনেই আমেরিকার খরচ হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার। যুদ্ধের খরচ চালাতে মার্কিন কংগ্রেসের কাছে ২০০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত তহবিল চেয়েছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম হিসাব কষে দেখিয়েছে, যুদ্ধের জন্য ২০০ বিলিয়ন খরচ না হলে আমেরিকার সব পড়ুয়াকে ২০ বছর নিখরচায় পড়ানো যেত। প্রায় এক দশক ধরে সব গৃহহীনদের মাথায় ছাদের ব্যবস্থা করা যেত। ৬০ লক্ষ পড়ুয়ার স্টাডি লোন মকুব করা যেত। কিন্তু ট্রাম্প এই তহবিল চেয়েছেন গোলাগুলি কিনতে। সেই তহবিলও কি পর্যাপ্ত হবে? যুদ্ধের জন্য মার্কিন শেয়ার বাজারে ক্ষতির অঙ্ক ৩.২ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। ট্রাম্পের খামখেয়ালিপনার জন্য খনিজ তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৬৭ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ ১১০ ডলার ছুঁয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে রাখায় বিশ্বের মোট তেল আদানপ্রদানের প্রায় ২০% এখন থমকে রয়েছে। যার প্রভাব ভারত-সহ উপমহাদেশে এসেও পড়েছে। আর কতদিন এই যুদ্ধ চলবে? ইরান এখনও মাথা নোয়ানোর লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ট্রাম্পও থামতে নারাজ। হরমুজ-সহ মধ্য প্রাচ্যের পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হয় সেদিকেই এখন তাকিয়ে গোটা বিশ্ব।