
ওয়াশিংটন: আমেরিকায় সব ওলট-পালট। আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচনে বা মিড-টার্ম নির্বাচন (Midterm Elections) সেনেটে পাঁচটি আসন এবং হাউস অব রিপ্রেজ়েন্টেটিভসের (House of Representatives) অর্ধেক ডজনেরও বেশি আসন জিতে মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা (Democrats)। এই ফলাফলকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) বিরুদ্ধে ভোটারদের সরাসরি প্রতিবাদ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কারণ, নির্বাচনী প্রচারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভোটারদের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন, “তাঁরা যেন মনে করেন যে তিনিই এই নির্বাচনে প্রার্থী”।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার শাসনকালে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া বিভিন্ন ইস্যুর উপর কার্যত গণভোট হয়ে উঠেছিল এই নির্বাচন। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ, শুল্কনীতি এবং ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধ নিয়ে অসন্তোষের প্রভাব পড়েছে রিপাবলিকানদের ভোটব্যাঙ্কে, তা ভোটের ফলাফলেই স্পষ্ট। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে জ্বালানির দামও অনেকটা বেড়েছে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের অনুমোদনের হারও সর্বনিম্ন স্তরের কাছাকাছি রয়েছে।
আমেরিকার মিডটার্ম নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় নিঃসন্দেহে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির জন্য একটি বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। ডেমোক্র্যাটরা শুধু প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (House of Representatives) নয়, সেনেটেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। অর্থাৎ, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসের দুই কক্ষই ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এর ফলে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকলেও তাঁর প্রশাসনের উপর কংগ্রেসের নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ অনেক বেড়ে যাবে।
এই বিষয়টি বুঝতে গেলে প্রথমে আমেরিকার ক্ষমতার কাঠামোটা বুঝতে হবে।
আমেরিকার কংগ্রেসের দুটি কক্ষ রয়েছে। নিম্নকক্ষ হল হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ ( House of Representatives)। এতে মোট ৪৩৫টি আসন রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ২১৮। অন্যদিকে সেনেট (Senate) হল উচ্চকক্ষ। এখানে মোট ১০০টি আসন রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৫১টি আসন।
মিড টার্ম নির্বাচনে দুই কক্ষেই ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। শেষ আপডেট অনুযায়ী, ডেমোক্রাটরা ৫৪টি এবং হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে ডেমোক্রাটরা ২২৮টি আসন পেয়েছে। ফলে তারা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা পাবে।
এটাই হবে ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। হাউসের বিভিন্ন কমিটির মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, সরকারি অর্থের ব্যবহার, ট্রাম্প পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত, অভিবাসন নীতি নিয়ে তদন্ত করতে পারবে। এছাড়া বিচার বিভাগ ও প্রশাসনিক সংস্থাগুলির স্বাধীনতা, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়েও তদন্ত করতে পারবে। কমিটি তদন্তের প্রয়োজনে নথি চাইতে পারবে, সরকারি আধিকারিকদের তলব করতে পারবে এবং সাক্ষ্যগ্রহণ করতে পারবে।
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা। সমন (Subpoena)-এর মাধ্যমে কংগ্রেস কাউকে নির্দিষ্ট নথি জমা দিতে অথবা শুনানিতে হাজির হতে বাধ্য করতে পারে। অর্থাৎ, হোয়াইট হাউসের আধিকারিকদেরও কংগ্রেসের তদন্তের মুখোমুখি হতে হতে পারে। অবশ্য এর সাংবিধানিক ও আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (House of Representatives)-এর হাতে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট (Impeachment) আনার ক্ষমতা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা চাইলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, হাউসে ইমপিচমেন্ট পাশ হওয়া মানেই প্রেসিডেন্টকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া নয়।
সেনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়া ট্রাম্পের জন্য আরও একটি বড় ধাক্কা। কারণ মার্কিন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ ও বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সেনেটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কী কী ক্ষমতা-
আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নিজের পছন্দমতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে মনোনয়ন করেন। যেমন:
এই নিয়োগগুলির ক্ষেত্রে সেনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয়। এখন সেনেট ডেমোক্র্যাটদের হাতে থাকায় তারা ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীদের অনুমোদন না-ও দিতে পারে। বিশেষ করে কোনও সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতির পদ খালি হলে ট্রাম্প নিজের পছন্দের বিচারপতি নিয়োগ করতে পারবেন না, যদি সেনেট অনুমোদন না দেয়।
আমেরিকার বিচারব্যবস্থায় ফেডারেল বিচারপতিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁরা দীর্ঘমেয়াদে, সাধারণত আজীবন দায়িত্ব পালন করেন। সেনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ট্রাম্পের পছন্দের রক্ষণশীল বিচারপতিদের নিয়োগ আটকে যেতে পারে। ফলে বিচার বিভাগে নিজের রাজনৈতিক ও আদর্শগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ ট্রাম্পের কমবে।
সেনেটের বিভিন্ন কমিটিও ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে পারবে। বিশেষ করে বিদেশ সম্পর্ক কমিটি (Foreign Relations Committee), জুডিশিয়ারি কমিটি (Judiciary Committee), সশস্ত্র সার্ভিস কমিটি (Armed Services Committee), গোয়েন্দা কমিটি (Intelligence Committee), হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কমিটি (Homeland Security Committee)। এই কমিটিগুলি প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে শুনানি ও তদন্ত করতে পারবে।
এটাই হল আসল প্রশ্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে থাকবেন। তাঁর হাতে এগজেকিউটিভ পাওয়ার (Executive Power) থাকবে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। এটাকে আমেরিকার রাজনৈতিক পরিভাষায় বলা হয় ডিভাইডেড গভর্মেন্ট (Divided Government)। এর ফলে ট্রাম্পের সামনে অন্তত সাতটি বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
ট্রাম্প যদি নতুন কোনও আইন করতে চান, তাহলে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। কিন্তু এখন দুই কক্ষেই বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠ। ধরা যাক, ট্রাম্প নতুন কোনও ইমিগ্রেশন আইন (Immigration Law) আনতে চান। ডেমোক্র্যাটরা তাতে বাধা দিতে পারেন। একইভাবে তাঁর অর্থনৈতিক নীতি, করনীতি, স্বাস্থ্যনীতি বা অন্যান্য আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রেও বাধা আসতে পারে।
আমেরিকায় কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। প্রতি বছর সরকারের বিভিন্ন দফতর, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অন্যান্য খাতে অর্থ বরাদ্দের জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের পছন্দের বাজেট আটকে দিতে বা নিজেদের শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে।এর ফলে বাজেট স্ট্যান্ডঅফ (Budget Standoff) তৈরি হতে পারে। দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছতে না পারলে সরকারের শাটডাউন (Government Shutdown) পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ, অর্থ বরাদ্দ না হওয়ায় কেন্দ্রীয় সরকারের কিছু পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
এটি রাজনৈতিকভাবে ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা হতে পারে। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ এবং সেনেট—দুই জায়গাতেই তদন্তের সুযোগ থাকবে। ট্রাম্পের প্রশাসনকে বিভিন্ন বিষয়ে জবাবদিহি করতে হতে পারে। সংবাদমাধ্যমে তদন্ত, শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং নতুন অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এর ফলে প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি ট্রাম্পকে রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়েও অনেক সময় ব্যয় করতে হবে।
বিদেশনীতি ও যুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে চাপ-
ট্রাম্পের ইরান নীতি, সামরিক অভিযান এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে কংগ্রেসের ডেমোক্র্যাটরা প্রশ্ন তুলতে পারবে। বিশেষ করে যুদ্ধ পরিচালনায় প্রশাসনের সিদ্ধান্ত, সামরিক ব্যয় এবং কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, আমেরিকার সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্টই কম্যান্ডার ইন চিফ (Commander-in-Chief)। তাই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলেও ডেমোক্র্যাটরা সরাসরি প্রেসিডেন্টের সামরিক কমান্ড গ্রহণ করতে পারবে না।
ক্যাবিনেট (Cabinet) ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে বাধা-
সেনেটে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের মনোনীত গুরুত্বপূর্ণ আধিকারিকদের নিয়োগ আটকে দিতে পারে। ফলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দীর্ঘায়িত হতে পারে। এতে বিভিন্ন সরকারি দফতরের কাজের গতি প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের সম্ভাবনা-
ডেমোক্র্যাটরা চাইলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে।সেনেটে দোষী সাব্যস্ত হলে অর্থাৎ, হাউসে ডেমোক্র্যাটরা ইমপিচমেন্ট (Impeachment) করতে পারলেও সেনেটে দোষী সাব্যস্ত করতে উপস্থিত সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন। শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই ট্রাম্পকে সরানো সম্ভব নয়।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দুর্বল হতে পারে-
দুই কক্ষই হারানোর ফলে রিপাবলিকান দলের মধ্যেও ট্রাম্পের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে রিপাবলিকান নেতাদের মধ্যে নতুন নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হতে পারে।
না, একেবারেই নয়। এখানেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টশিয়াল সিস্টেম (Presidential System)-এর বিশেষত্ব।ট্রাম্প এখনও প্রেসিডেন্ট। তাঁর হাতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা থাকছে। এগজেকিউটিভ অর্ডার জারি থেকে শুরু করে প্রশাসন পরিচালনা, কম্যান্ডার ইন চিফ- সবই ট্রাম্পের হাতে রয়েছে।
বিদেশনীতি পরিচালনাও মূলত প্রেসিডেন্টই করেন। তবে নতুন আইন পাস, বাজেট অনুমোদন কংগ্রেস করে।
আবার ক্যাবিনেট নিয়োগ অনুমোদন, ফেডারেল বিচারপতি নিয়োগ অনুমোদন সেনেট করে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ট্রাম্প কোনও বিলের বিরোধিতা করে প্রেসিডেন্টশিয়াল ভেটো (Presidential Veto) দিতে পারবেন। কিন্তু কংগ্রেসের দুই কক্ষেই যদি দুই-তৃতীয়াংশ সদস্য সেই ভেটোর বিরুদ্ধে ভোট দেন, তাহলে প্রেসিডেন্টের ভেটো বাতিল করে, আইন পাশ করা সম্ভব। অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটদের সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই ট্রাম্পের প্রতিটি সিদ্ধান্ত বাতিল করা যাবে না।
আগামী দুই বছরে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
নতুন কংগ্রেসের মেয়াদ শুরু হবে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি। তার আগে বিদায়ী কংগ্রেসই দায়িত্বে থাকবে।