
ইরানের মেরুদণ্ড ভাঙতে এবার তেহরানের তেল শোধনাগারে হামলা আমেরিকা-ইজরায়েলের। রাতভর বোমাবর্ষণে দাউদাউ করে জ্বলছে তেহরানের সবচেয়ে বড় তেলের ডিপো। শুধু তেল নয়, ইরানের জল শোধনাগারেও ইজরায়েলি হামলার অভিযোগ।
মধ্যপ্রাচ্যের মহাযুদ্ধে এই প্রথম একে অপরের জ্বালানি পরিকাঠামোয় হামলা চালাল ইরান ও ইজরায়েল। দক্ষিণ ইরানের সবচেয়ে বড় অয়েল রিফাইনারি কমপ্লেক্স ‘শাহর-এ-রে’-তে রাতভর আমেরিকা ও ইজরায়েলি বায়ুসেনার বোমাবর্ষণ। দাউদাউ করে জ্বলছে করাজ শহরের ফরদিস তেল ডিপো। তেহরানের কোহক ও শাহরান রিফাইনারি-ও। ৭ মার্চ থেকে ইরানের অন্তত ৩০টি তেলের ডিপো ও শোধনাগারে তীব্র বোমাবর্ষণ করে চলেছে মার্কিন বায়ুসেনা ও IDF। ইজরায়েলি হামলায় শোধনাগারের পাঁচিল ভেঙে তেল ছড়িয়ে পড়েছে তেহরানের রাস্তা ও ড্রেনে। সেখানেও আগুন ধরে গেছে। বহু সাধারণ মানুষ আগুনে পুড়ে মারা গেছেন বলে ইরানি সংবাদমাধ্যম দাবি করছে। কালো ধোঁয়ায় শহরের আকাশ ঢেকে গেছে। আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে লাভাসান যাওয়ার হাইওয়ে থেকে। যদিও ইরানি পেট্রোলিয়াম মন্ত্রীর দাবি, হামলায় তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।
ইরানি সেনার ঘাঁটি, পরমাণু কেন্দ্রে, অস্ত্রাগারের পর এবার টার্গেট তেলের ডিপো। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, খুব ভেবেচিন্তেই ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু তেহরানের তেল ভাণ্ডারে হামলা দেগেছেন। শাহরান তেলের ডিপো থেকে গোটা তেহরানে জ্বালানি সরবরাহ হয়। ইরানি সেনার রেভোলিশনারি গার্ড কোর বা IRGC-র সব ট্রাকের জ্বালানি এখান থেকেই সরবরাহ হয়। তেল না ভরতে পারলে ইরানি সেনা ও অস্ত্রের যাবতীয় গতিবিধি থমকে যাবে। শাহরানের তেলেই তেহরানে হাসপাতাল, স্কুলে আলো জ্বলে। সবমিলিয়ে রাজধানীর তেহরানের প্রায় দেড় কোটি মানুষ সরাসরি এই ডিপোর জ্বালানির উপর নির্ভরশীল। ইরান প্রতিদিন ২.৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল উৎপাদন করলেও শোধনাগারগুলি আধুনিক নয় বলে ইরানকেও খানিকটা জ্বালানি আমদানি করতে হয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জন্য ইরান নিজেদের শোধনাগারগুলিকে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে আধুনিক করতে পারেনি। ক্যাস্পিয়ান সাগর মারফত রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল ও গ্যাসোলিন কিনতে হয় ইরানকে। এবার শাহরান ডিপো ইজরায়েলি হামলায় পুড়ে ছারখার হয়ে যাওয়ায় দেশের ভিতরে নাগরিকদের চাহিদা, সেনার জন্য প্রয়োজনীয় তেলের যোগানে টান পড়তে বাধ্য। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় তেল আমদানিও বন্ধ। তেহরানের একটা বড় অংশে এখন ঘনঘন লোডশেডিং।
তবে পাল্টা হামলার ক্ষমতা কমলেও এখনও দাঁতে দাঁত চেপে লড়ছে ইরান। সলিড ফুয়েল মিসাইল ‘খাইবার’ দিয়ে হামলা হয়েছে ইজরায়েলের সবচেয়ে সুরক্ষিত হাইফা অয়েল রিফাইনারিতে। বাজান গ্রূপ নিয়ন্ত্রিত এই শোধনাগার ইজরায়েলের অভ্যন্তরীন চাহিদার ৫০-৬০% জ্বালানি সরবরাহ করে। শুধু ইজরায়েলে নয়, সৌদি আরব, UAE, কাতার-সহ অন্য গালফ দেশের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস সেক্টরেও ইরান মিসাইল ও ড্রোন হামলা শুরু করেছে। তবে হামলা, পাল্টা হামলায় ইরানের ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় চীনে তেল পাঠাতেও ইরানকে বেগ পেতে হচ্ছে। ফলে সরকারি কোষাগারেও আমদানি কমেছে। এর মধ্যে এবার ইরানে তৃতীয় এয়ারক্রফ্ট কেরিয়ার uss জর্জ বুশ পাঠাচ্ছেন ট্রাম্প। ইরান আপাতত খড়গ আইল্যান্ড, বন্দর আব্বাস ও আবদান রিফাইনারি চালু থাকায় প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নিলেও, দেশের বাসিন্দাদের নিত্যদিনের চাহিদা মেটাতে পারছে না।
আর শুধু তেল নয়, জল পরিশোধনা-গারেও হামলার অভিযোগ ইরানি বিদেশমন্ত্রীর। কাশিম আইল্যান্ডে ডি-স্যালিনেশন প্ল্যান্টে হামলায় ৩০টি গ্রামের মানুষ এখন খাওয়ার জল পাচ্ছেন না। ইজরায়েল ও মার্কিন হানায় তছনছ হয়ে গেছে কাশিম ফেসিলিটি। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে ইরানি সরকার জলের ট্যাঙ্কারের মাধ্যমে জলের চাহিদা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। ফলে সবমিলিয়ে এই মুহূর্তে ব্যাপক চাপে ইরান।