
কলকাতা: রাহুল আর নেই। তাঁর মৃত্যুর সুবিচার চেয়ে এবার আইনের পথে হাঁটলেন স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা সরকার। কলকাতার রিজেন্ট পার্ক থানায় এবং পরে ওড়িশার তালসারিতে গিয়ে এফআইআর দায়ের করেছেন প্রোডাকশন কোম্পানির পাঁচজনের বিরুদ্ধে। কী অভিযোগ করেছেন প্রিয়াঙ্কা?
গত ২৯ মার্চ ওড়িশার তালসারিতে “ভোলে বাবা পার করেগা” সিরিয়ালের শুটিং করতে গিয়ে সমুদ্রের জলে ডুবে অকালে মৃত্যু হয় রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ঠিক কী ঘটেছিল ওই দিন, তা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা-বর্ণনা উঠে এসেছে। মৃত্যু নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। রাহুলের এই আকস্মিক মৃত্যুতে টলিপাড়ায় শোকের ছায়া নামে। সেই শোক কিছুটা সামলে পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন প্রিয়ঙ্কা। সঙ্গে ছিলেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে চিরঞ্জিৎ চক্রবর্তী, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় সহ একাধিক কলাকুশলী। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৬১(২), ১০৬(১) এবং ২৪০ ধারায় মামলা করা হয়েছে। তালসারিতে ব্যক্তিগতভাবেও অভিযোগ দায়ের করেছেন প্রিয়াঙ্কা। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১০৬(১), ২৪০, ও ৩(৫) ধারায় মামলা রুজু করেছেন।
জানা গিয়েছে, প্রযোজনা সংস্থা ‘ম্যাজিক মোমেন্টস’-এর কর্ণধার শৈবাল বন্দ্যোপাধ্যায় ও লীনা গঙ্গোপাধ্যায়, পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল, ফ্লোর এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার শান্তনু নন্দী এবং প্রযোজক সংস্থার ম্যানেজার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছেন প্রিয়াঙ্কা। এফআইআরের বয়ানে তুলে ধরেছেন কীভাবে প্রোডাকশন হাউসের গাফিলতিতে রাহুলের মৃত্য়ু হয়েছে এবং নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ওই সংস্থা মিথ্যাচার করেছে।
প্রিয়াঙ্কা তাঁর বয়ানে লিখেছেন, ম্যাজিক মোমেন্টস সংস্থা ওই দিন তালসারিতে শুটিংয়ের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে কোনও অনুমতিই নেয়নি। সেখানে সুরক্ষা-নিরাপত্তার কোনও ব্যবস্থা ছিল না। ক্রু সদস্যদের অডিয়ো-ভিডিয়ো বয়ান, যা সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরছে, নিউজ চ্যানেল ও প্রিন্ট মিডিয়ায় দেখা যাচ্ছে, তা নিয়ে চরম বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। এর থেকে প্রমাণ হচ্ছে যে প্রোডাকশন হাউস ও এর সদস্যদেরই গাফিলতি ছিল।
প্রিয়াঙ্কা বারবার উল্লেখ করেছেন যে ওই দিন তালসারির সমুদ্র সৈকতে শুটিংয়ের সময় কোনও সুরক্ষা ব্যবস্থা, নিয়ম বা প্রোটোকল মানা হয়নি, এই গাফিলতির কারণেই তাঁর স্বামী রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়েছে।
এই দুর্ঘটনা নিয়ে ক্রু মেম্বারদের বয়ান আরও সন্দেহ তৈরি করেছে কারণ বিভিন্ন জন বিভিন্ন বর্ণনা দিয়েছে ঘটনার। প্রিয়ঙ্কা বলেছেন যে ওই দিনের সত্যকে চাপা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় কিছু বাসিন্দা, যারা ঘটনার প্রত্য়ক্ষদর্শী ছিলেন, সংবাদ মাধ্যমে তাদের বয়ানের সঙ্গে ক্রু মেম্বারদের বয়ান মিলছে না বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন প্রিয়াঙ্কা।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা বারবার সতর্ক করেছিলেন যে যথাযথ সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া ওই জায়গা শুটিংয়ের উপযুক্ত নয়। শুটিং স্থলের চোরাবালি ও চোরা স্রোত নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। তাও পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল, ফ্লোর এক্সিকিউটিভ প্রোডিউসার শান্তনু নন্দী এবং প্রযোজক সংস্থার ম্যানেজার চন্দ্রশেখর চক্রবর্তী শুটিং চালিয়ে যান, যার ফলস্বরূপ রাহুল ও সহঅভিনেত্রী শ্বেতা মিশ্র জলে পড়ে যান। উপস্থিত সকলে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা করে। শ্বেতাকে উদ্ধার করা গেলেও, রাহুলের ডুবে মৃত্যু হয়। দিঘা স্টেট জেনারেল হাসপাতালে তাঁকে মৃত অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছিল।
প্রিয়াঙ্কা অভিযোগ পত্রে লিখেছেন, “রাহুলের মৃত্যুতে আমার ও আমার পরিবার, বিশেষ করে আমার নাবালক সন্তান সহজ বন্দ্যোপাধ্য়ায়ের উপরে বিপর্যয় নেমে এসেছে।”
গোটা ঘটনায় যেভাবে বিভিন্ন বর্ণনা উঠে এসেছে এবং সংস্থার বয়ানেই প্রমাণিত হয় যে প্রোডাকশন হাউসের চরম গাফিলতি ছিল। তারা ঘটনায় নিজেদের দায়বদ্ধতা এড়িয়েছে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে এই ঘটনায় তথ্যের ভুল ব্যাখ্যা করেছে। মিথ্যা তত্ত্ব তৈরি করেছে আইনের হাত থেকে বাঁচতে।