
অমিতাভ বচ্চনের জন্মদিন। আর এই বিশেষ দিনেই নিউজ নাইনের সাক্ষাৎকারে বিগ বি-কে নিয়ে একগুচ্ছ অজানা গল্প শোনালেন তাঁর দীর্ঘ ৫২ বছরের সঙ্গী তথা মেকআপ আর্টিস্ট দীপক সাওয়ান্ত। অমিতাভের আইকনিক ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি থেকে শুরু করে তাঁর কাজের প্রতি ডেডিকেশন, গত পাঁচ দশকে অভিনেতার লুক তৈরির নেপথ্যে প্রধান কারিগর ছিলেন এই দীপকই।
বিগ বির সঙ্গে কাটানো সময় নিয়ে কী কী বলেছেন তিনি?
প্রবীণ মেকআপ আর্টিস্ট পন্ধরী দাদার কাছে কাজ শিখতেন দীপক। ‘রাস্তে কা পাত্থর’ ছবির সেটে অমিতাভের সঙ্গে তাঁর প্রথম দেখা। পুরনো দিনের কথা মনে করে দীপক বলেন, “আমি রাজ খোসলা ফিল্মসের ‘রাস্তে কা পাত্থর’ ছবিতে কাজ করছিলাম, যার শুটিং ‘জঞ্জির’-এর সঙ্গেই চলছিল। সে দিন মেকআপ দাদা সেটে পৌঁছতে না পারায়, তিনি তাঁর বদলে আমাকে পাঠান। মেকআপের কাজ শেষ হওয়ার পর অমিত জি বলেন, ‘তুমি এত ভালো কাজ করো, পেছনে কেন থাকো?’ তবে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধায় আমি তখন স্বাধীনভাবে কাজে নেমে পড়তে পারিনি।”
পরে অমিতাভের গাড়ির চালক নাগেশ মারফত খবর আসে, বিগ বি চান দীপক তাঁর ব্যক্তিগত মেকআপ আর্টিস্ট হোন। কিন্তু তখন অমিতাভের ছবি সেভাবে চলছিল না। তাই প্রোডাকশন ম্যানেজাররা রাজি হননি। তবে পরিস্থিতি বদলায় ১৯৭৩ সালে। সে বছর ‘জঞ্জির’ সুপারহিট হয়। দীপক জানান, “অমিত জি আমাকে ফোন করে বলেন, ‘এবার থেকে তুমি পার্সোনাল মেকআপ আর্টিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করো।’ সেই থেকে শুরু, আর প্রায় ৫২ বছর পর আজও একসঙ্গে কাজ করছি।”
চিত্রনাট্য অনুযায়ী মেকআপ করতেন দীপক। তাঁর কথায়, “যদি কোনও ইমোশনাল দৃশ্য থাকত, আমি মেকআপটা একটু তৈলাক্ত রাখতাম। মজার বা গানের দৃশ্যের জন্য তাঁকে খুব উজ্জ্বল দেখানোর ব্যবস্থা করতাম। আর অ্যাকশন দৃশ্যের জন্য লালচে আভা রাখতাম।”
২০০০ সালে ‘কৌন বনেগা ক্রোড়পতি’ (KBC) এবং ‘অক্ষ’ (২০০১) ছবির সময় অমিতাভের সেই আইকনিক ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি তৈরি হয়। আঠা দিয়ে নকল দাড়ি লাগালে ত্বকের ক্ষতি হতে পারে। সেই ভেবে দীপকই আসল দাড়ি রাখার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, “আমি তাঁকে বলেছিলাম, ‘অমিত জি, আপনি কেন নিজের দাড়িটা একটু বড় করছেন না, যাতে আমি তার ওপর কাজ করতে পারি? এতে আপনার মুখে ফুটবে না।’ ঘটনাক্রমে তাঁর আসল দাড়ি সাদাই ছিল।”
শুধু অভিনয় নয়, অমিতাভের সততাও দীপককে মুগ্ধ করেছে। এবিসিএল (ABCL) কোম্পানির সময় চরম আর্থিক সঙ্কটে পড়েছিলেন বিগ বি। দীপক জানান, “তিনি প্রায় ১০০ কোটি টাকার এক বিশাল ঋণ নিয়েছিলেন, কিন্তু অমিত জি বলেছিলেন, ‘আমি যাঁদের কাছে ঋণী, তাঁদের প্রত্যেকের এক একটি টাকা আমি ফিরিয়ে দেব।'” সত্যিই অমিতাভ নিজে যোগাযোগ করে সবার টাকা ফিরিয়ে দেন। দীপকের কথায়, “কখনও কখনও মনে হয়, এমন একজন ভালো মানুষকে যাঁরা বিরক্ত করে তাঁরা নেহাতই বোকা। তিনি কারও একটি টাকাও নিজের কাছে রাখেননি।”
মেগাস্টার হয়েও অমিতাভের সময়ানুবর্তিতা আজও শিক্ষণীয়। দীপক বলেন, “তিনি সময়ের আগে পৌঁছন, আর আপনি না বলা পর্যন্ত তিনি সেট ছাড়েন না, আজও। অমিত জি-কে বলতে হয়, ‘অমিতাভ জি, শুটিং শেষ, আপনি এবার যেতে পারেন।’ একজন প্রযোজকের কাছে এটা একটা আশীর্বাদ।”
এই দীর্ঘ জার্নিতে জয়া বচ্চনের অবদানের কথাও স্মরণ করেছেন দীপক। তাঁর কথায়, “আমি জয়া জি-কে পুরো কৃতিত্ব দেব কারণ তিনি সন্তানদের দিকে নজর দিয়েছিলেন। তখন একটানা কাজ চলত, তাই সময় পাওয়া যেত না। জয়া জি সন্তানদের খুব ভালোভাবে মানুষ করেছেন, আর তিনি সবসময় অমিতাভ জি-কে সাহায্য করেছেন। এটা অনেকটা গাড়ির দুটো চাকার মতো, একটা চাকা জয়া জি, আরেকটা চাকা অমিতাভ জি, তাই তাঁদের জীবনের গাড়ি এত সুন্দরভাবে চলছে।”
সবশেষে দীপকের গলায় ঝরে পড়ে কৃতজ্ঞতা। তিনি বলেন, “১৪০ কোটি মানুষের মধ্যে আমার মতো একজন মেকআপ আর্টিস্টকে সঙ্গে রাখা এবং ৫২ বছর ধরে পাশে থাকা, কোনও বিপদে পড়তে না দেওয়া… এর পুরো কৃতিত্ব অমিত জি-র।”