প্রয়াত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বিভা সেনগুপ্ত
পরবর্তীতে মায়া সেনের হাত ধরেই তাঁর পরিচয় ঘটে কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা নীলিমা সেনের সমসাময়িক হলেও, প্রচারের আলো বা খ্যাতির মোহ তাঁকে কখনওই আকৃষ্ট করতে পারেনি। নিভৃতে নিজের মতো করে গান ও সুরের সাধনা করে যাওয়াটাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।

প্রয়াত বর্ষীয়ান রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী বিভা সেনগুপ্তের। মঙ্গলবার সকালেই কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন এই গুণী শিল্পী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। তাঁর এই প্রয়াণে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভুবনে এক প্রচারবিমুখ, নিষ্ঠাবান ও বর্ণময় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল।
মূলত ত্রিপুরার জন্ম হলেও বিভা সেনগুপ্তের দীর্ঘ ও বর্ণময় সঙ্গীতজীবনের মূল কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল কলকাতা। ১৯৫৯ সালে কলকাতায় থিতু হওয়ার পর থেকেই তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেন। সঙ্গীতের প্রাথমিক তালিমের জন্য তিনি প্রথমে যুক্ত হন প্রখ্যাত শিল্পী মায়া সেনের সঙ্গে। পরবর্তীতে মায়া সেনের হাত ধরেই তাঁর পরিচয় ঘটে কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা মিত্র, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা নীলিমা সেনের সমসাময়িক হলেও, প্রচারের আলো বা খ্যাতির মোহ তাঁকে কখনওই আকৃষ্ট করতে পারেনি। নিভৃতে নিজের মতো করে গান ও সুরের সাধনা করে যাওয়াটাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।
পরবর্তী সময়ে সাগর সেন প্রতিষ্ঠিত স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘রবিরশ্মি’-র সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সেখানে অত্যন্ত নিষ্ঠা ও কড়া অনুশাসনের সঙ্গে তিনি বহু শিক্ষার্থীকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের পাঠ দিয়েছেন। ইঁদুরদৌড়ের মতো বাণিজ্যিক সাফল্যের পিছনে তিনি কখনও ছোটেননি। নিজের গায়কী ও বাণীর প্রতি খাঁটি নিষ্ঠাই ছিল তাঁর মূল পরিচয়। বিশেষ করে গুরু দেবব্রত বিশ্বাসের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা ছিল আজীবন অটুট; প্রতি বছর গুরুর জন্মদিনটি অত্যন্ত ভক্তিভরে পালন করা ছিল তাঁর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম।
জীবনের একেবারে অন্তিম পর্যন্ত সুরের সঙ্গে তাঁর এই নিবিড় সম্পর্ক নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কাছেও এক অনন্য অনুপ্রেরণা হয়ে রয়েছে। কিছুদিন আগেই বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে বিশেষ সংবর্ধনা জানানো হয়েছিল। সেই স্মৃতি আজ ভিড় করছে সতীর্থ ও অনুরাগীদের মনে। তাঁর প্রয়াণে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরের আকাশে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। আপাদমস্তক একজন সঙ্গীতসাধক হিসেবে বিভা সেনগুপ্তের নাম বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাসে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।
