
মুক্তি পেয়েছে স্টুডিয়ো নাইন প্রযোজিত সৌমিক সেন পরিচালক ‘জ্যাজ সিটি’। দর্শকদের অনেকেই আপ্লুত এই ওয়েব সিরিজ দেখে। সোশ্যাল মিডিয়াতে দেবারতি রায় লিখলেন, ”বাবার দিকের পূর্বজনের আদি ভিটে ছিল ঢাকা। মা আবার কট্টর এপার বাংলা। ফলে এপার ওপারের মাঝে ভাসতে ভাসতে ছোটবেলা থেকে কখনও রান্না নিয়ে, কখনও ভাষা নিয়ে কখনও বা কালো জিরে আর সরষে বাটার দ্বন্দ্ব নিয়ে বয়স বাড়তে দেখেছি। যা দেখিনি তা হলো “তোদের দেশ তো এটা না”, “তোদের পিঠে তো কাঁটাতারের দাগ”, “তোদের অনেকেই উদ্বাস্তু”। এগুলো শুনিনি। বলা ভালো বাড়িতে শুনিনি। শিখিনি। বাইরে শুনেছি। মজার ছলে, ঠাট্টা করে এসব নাকি বলাই যায়। অথচ মাকেই দেখেছি ওপার বাংলার প্রতি অমোঘ টান। মা শিখিয়েছে বাংলা তো একটাই। ‘আমার সোনার বাংলা’ শুনে চোখ ভিজে যেতে দেখেছি প্রতিবার। মুক্তিযুদ্ধের গল্প শুনেছি। এ হেন পরিবারে যাঁরা বড় হয়েছেন তাঁরা বোঝেন প্রত্যেকবার ইতিহাসের খুব কাছাকাছি এলে গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে কাঁটাতারের বিভাজন। মনে হয় আমার বাড়ির লোকই তো ওই দেশে আছে। তাদের যদি ছাদে উঠলে দেখা যেত।
এতগুলো কথা হঠাৎ লেখার কারণ একটা গল্প। সৌমিক সেন পরিচালিত ‘জ্যাজ্ সিটি’। একটা সিরিজ যেটা তৈরি হয়েছে আমার বাংলার জোর করে মুছে ফেলতে চাওয়া ইতিহাসকে তুলোর মোড়কে জড়িয়ে। যেটার রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে স্বাধীনতার গল্প, দেশভাগের যন্ত্রণা, ক্ষমতার ষড়যন্ত্র এবং চির শাশ্বত প্রেম। একটা থেকে যাবার মতো কাজ করতে কতটা যত্ন লাগে, সময় লাগে, আদর লাগে তা যাঁরা দেখবেন, জানবেন। সিরিজটির শুধু চিত্রনাট্য এবং সংলাপই যথেষ্ট দর্শককে দীর্ঘ সময় পর্দামুখী করে রাখার জন্য। প্রত্যেকটা ফ্রেম, চিত্রগ্রহণ এবং প্রেক্ষাপট অনুযায়ী কালার-এর তীব্রতার মাপ অত্যন্ত প্রশংসনীয়। গোটা সিরিজ জুড়ে প্রত্যেকটা চরিত্র এবং উক্ত চরিত্রের অভিনেতারা প্রত্যেকটা সিনের সঙ্গে জাস্টিস করেছেন।
বহুদিন বাদে বাংলার কোনও অভিনেতাকে হিরো শব্দটির সম্মান রাখতে দেখলাম। ‘আরিফিন শুভ’র লুক, চার্ম, তাকানো, হাসি দেখে বহুদিন বাদে মনে হলো ওই তো, পর্দায় কোনও এইট্টিজ-এর হিরো হাঁটছেন। এত সুন্দর করে যে ভাষাটা বলতে পারা যায় এবং নায়ক কে যে এই ভাষাটা শিখতে হয় তা প্রায় ভুলতে বসেছিলাম। জিমি যখন গাড়ি থেকে নেমে নিজের অতীতের সামনে দাঁড়িয়ে শিকড়কে দু’ চোখে টেনে নিলেন কী যেন একটা ম্যাজিক পর্দায় করলেন। এই সিনটি বহুদিন মনে গেঁথে থাকবে। গোটা সিরিজে ছোট অথচ অনেকগুলি প্রয়োজনীয় চরিত্রে যাঁরা অভিনয় করলেন, তাদের অনেককেই ব্যক্তিগত ভাবে চিনি। একটুও বায়াসড্ না হয়ে বলছি আমি ছোট পাঠে এত নিপুণ বা সিরিয়াস অভিনয় বাংলার খুব কম কাজে দেখেছি। অথচ ছোট একটা খেলো সংলাপ বা অভিনয়ও মুহূর্তে একটা গোটা সিনেমার ইলিউশনকে চুরমার করে দিতে পারে। কিন্তু যাঁদের দেখলাম তাদের প্রত্যেকে তীক্ষ্ণ ও সাবলীল, ট্রেইন্ড। শ্রেয়া ভট্টাচার্য ও তনিকা বসু আমার খুবই প্রিয় অভিনেত্রী। এই সিরিজেও তাঁদের অভিনয় খুব দৃঢ়। আমি আরেকজনের অভিনয় মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখেছি তিনি হলেন অনিরুদ্ধ গুপ্ত। ওই চোখ ঘুমোতে না পারার মতো। তীক্ষ্ণ ছূ্রির ফলার মতো।
সমস্ত কাজের কিছু সমালোচনা আলোর পরেই দাঁড়িয়ে থাকে। এই পরিকাঠামো নিয়ে আঞ্চলিক ইন্ডাস্ট্রিতে এতো দীর্ঘ একটা প্রজেক্ট করতে গেলে হয়তো অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। সেগুলো বিশেষজ্ঞরা বলবেন। আমি বিশেষজ্ঞ নই। তাই পুরো সিরিজটায় আমি যত্ন বুনন, আর গল্পটাকেই একশো দেবো। সঙ্গীতের নির্বাচন যথাযথ হলেও ব্যবহারে আরেকটু তীক্ষ্ণতা আশা করেছিলাম। বিশেষত যখন মোচড় দেবার মতো প্রত্যেকটি সিন এই সিরিজে ছিল। আর কয়েকটি চরিত্রের বাংলা উচ্চারণ অকারণ ওয়েস্টার্ন অ্যাকসেন্টেড।
ইতিহাস ভুলিয়ে দেবার এই ডামাডোল সময়ে যখন ধর্ম আর সীমানার ভিত্তিতে লড়াই লাগিয়ে দেবার জন্য বিশ্ব রাজনীতি মুখিয়ে রয়েছে। তখন সূর্যের মতো ভারতবর্ষকে আশির দশকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করবেন না। ভারতবর্ষ তখনও তেজী ছিল, দৃপ্ত ছিল, ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল মানুষের জন্য। হিন্দু – মুসলমান নয়। শুধু মানুষের জন্য সমস্তটা দিয়ে দিয়েছিল দুটো দেশ। আর দুটো দেশের জন্য সমস্তটা দিয়ে দিয়েছিল কিছু মানুষ। তারা আজ অপ্রাসঙ্গিক। কিন্তু মিথ্যে নয়।”