জানেন কার দোষে ডাহা ফ্লপ হয়েছিল উত্তম-সুচিত্রার শেষ ছবি?
১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির হাত ধরে রুপোলি পর্দায় এই জুটির পথচলা শুরু। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করেছিলেন তাঁরা। এরপর আর বাঙালিকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘হারানো সুর’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘শাপমোচন’, ‘সবার উপরে’, ‘পথে হল দেরি’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘সপ্তপদী’, থেকে ‘সাত পাকে বাঁধা’—সিনেমাপ্রেমীদের একের পর এক কাল্ট ছবি উপহার দিয়েছেন এই যুগল।

টলিউডের ইতিহাসে একমেবদ্বিতীয়ম জুটি। একজন যদি পর্দায় রোম্যান্সের সংজ্ঞা বদলে দেওয়া ‘মহানায়ক’ হন, তবে অন্যজন বাঙালি দর্শকের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন পাতা ‘মহানায়িকা’। অন্য কারোর সঙ্গে জুটি বেঁধে বা একক দক্ষতায় ছবি করলেও, তাঁরা দুজনে স্ক্রিন শেয়ার করলেই যে জাদুর জন্ম হতো, তা টপকে যাওয়া ছিল অসম্ভব। উত্তম কুমার ও সুচিত্রা সেন নিজেরাও এই রসায়নের অমোঘ টানটা খুব ভালোভাবেই বুঝতেন। আর তাই যখনই এই জুটির নতুন কোনো ছবির কাজ শুরু হতো, নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিতেন তাঁরা। কিন্তু আপনি কি জানেন, যে জুটির নামের জোরেই প্রেক্ষাগৃহে হাউজফুল বোর্ড ঝুলত, তাঁদের জীবনের শেষ ছবিটিতে সবরকম মশলা থাকা সত্ত্বেও তা বক্স অফিসে মুখ থুবড়ে পড়েছিল? টানটান চিত্রনাট্য, চিরসবুজ গান আর তাঁদের চিরাচরিত রসায়নের ম্যাজিক—কোনো কিছুই সেই ছবিকে বাঁচাতে পারেনি। প্রযোজকের ঘরে যেটুকু টাকা এসেছিল, তা ছবির বাজেট বা নির্মাণ খরচের চেয়েও ঢের কম ছিল। একের পর এক সুপারহিট সিনেমা উপহার দেওয়া উত্তম-সুচিত্রা জুটির শেষ অধ্যায়টি কিন্তু লেখা হয়েছিল এক ‘ডাহা ফ্লপ’ দিয়ে।
পিছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৫৩ সালে ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবির হাত ধরে রুপোলি পর্দায় এই জুটির পথচলা শুরু। প্রথম ছবিতেই বাজিমাত করেছিলেন তাঁরা। এরপর আর বাঙালিকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ‘হারানো সুর’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘শাপমোচন’, ‘সবার উপরে’, ‘পথে হল দেরি’, ‘ইন্দ্রাণী’, ‘চাওয়া-পাওয়া’, ‘সপ্তপদী’, থেকে ‘সাত পাকে বাঁধা’—সিনেমাপ্রেমীদের একের পর এক কাল্ট ছবি উপহার দিয়েছেন এই যুগল। কিন্তু ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া এই জুটির শেষ ছবি ছিল ‘প্রিয় বান্ধবী’। ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিনেমার গুরুত্ব অপরিসীম হলেও, দুর্ভাগ্যবশত বক্স অফিসে তা বিন্দুমাত্র টিকতে পারেনি।
কী এমন ঘটেছিল যা এই ম্যাজিক জুটির শেষ ছবিকে এভাবে ডুবিয়ে দিল? এর নেপথ্যে ছিল সাতের দশকের এক ট্রাজিক ঘটনাপ্রবাহ। সত্তরের দশকের শুরুর দিকেই ‘প্রিয় বান্ধবী’ ছবির বেশ কিছুটা শুটিং সেরে ফেলেছিলেন উত্তম-সুচিত্রা। কিন্তু আচমকাই সেই সময় মুম্বই থেকে বড় ডাক আসে সুচিত্রা সেনের। সঞ্জীব কাপুরের সঙ্গে তাঁর ‘আঁধি’ ছবির শুটিং শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে দেশজুড়ে বিপুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং রাজনৈতিক কারণে কিছুদিনের জন্য নিষিদ্ধও হয়েছিল। অন্যদিকে উত্তম কুমারও তখন সবেমাত্র তাঁর ‘অমানুষ’ ছবির কাজ শেষ করে মুম্বইয়ে হিন্দি সংস্করণের ডাবিংয়ে চূড়ান্ত ব্যস্ত।
শোনা যায়, ছবির পরিচালক হীরেন নাগ সেই সময় আপ্রাণ চেষ্টা করেও সুচিত্রা সেনের কোনো ডেট (Date) পাচ্ছিলেন না। সুচিত্রা নাকি সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আঁধি’-র কাজ সম্পূর্ণ না করে তিনি মুম্বই থেকে কলকাতা ফিরবেন না। এদিকে উত্তম কুমার ডাবিংয়ের পাট চুকিয়ে নতুন ছবিতে হাত দেওয়ার আগে কিছুটা ফ্রি থাকায় পরিচালককে পরপর ডেট দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শুধু উত্তমকে দিয়ে তো আর জুটির ছবি সম্ভব নয়! অর্ধেক শুটিং হয়ে মাঝপথে আটকে রইল ‘প্রিয় বান্ধবী’।
দিনের পর দিন বিলম্ব হতে থাকায় ছবির মূল গল্প এবং চিত্রনাট্য তার স্বাভাবিক ছন্দ হারিয়ে ফেলে। পরিচালক হীরেন নাগ বুঝতে পেরেছিলেন, ছবি মুক্তি পেতে যত দেরি হবে, গল্পের আবেদন তত ফিকে হয়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই আশঙ্কাই সত্যি হল। সুচিত্রা সেনের ডেট দেওয়ার টালবাহানা আর লাগাতার দেরির কারণে ছবিটির কাজ যখন শেষ হল, ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা লেগেছিল পর্দায়। ছবি যখন শুরু হয়েছিল, তখন এই জুটির যে রূপ বা বয়স ছিল, দীর্ঘ দেরির পর ১৯৭৫ সালে মুক্তির সময়ে তাঁদের চেহারায় বয়সের ছাপ অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছবির শুটিং যে আলাদা আলাদা সময়ে এবং খাপছাড়াভাবে করা হয়েছে, তা গোটা সিনেমা জুড়েই ধরা পড়ছিল। ফলে উত্তম-সুচিত্রার চিরপরিচিত জাদুকরী রসায়নও ‘প্রিয় বান্ধবী’-র সেই দৃশ্যত খুঁতগুলোকে ঢেকে দিতে পারল না। আর এভাবেই টলিউডের স্বর্ণযুগের এই শ্রেষ্ঠ জুটির শেষ সিনেমাটি বক্স অফিসে এক চরম ব্যর্থতার ইতিহাস হয়ে রয়ে গেল।
