
নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR প্রক্রিয়া চলাকালীন যাঁরা বাসস্থান পরিবর্তন করেছেন, তাঁদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল হাইকোর্ট। ঠিকানা বদলালেই নতুন ভোটার হিসেবে ফর্ম ৬ পূরণ করা যাবে না। বরং আগে থেকে যাঁদের ভোটার তালিকায় নাম ছিল, এমন কোনও ব্যক্তি বাসস্থান পরিবর্তন করলে তাঁকে জমা দিতে হবে ফর্ম ৮। ভুল ফর্ম পূরণ করে মিথ্যা ঘোষণা দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা বা ফৌজদারি মামলা হতে পারে বলেও সতর্ক করেছে বম্বে হাইকোর্ট (Bombay High Court)।
গোয়া বেঞ্চের বিচারপতি বাল্মীকি মেনেজেস এবং বিচারপতি অমিত জামশেদকরকে নিয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ করেছে। আদালত জানিয়েছে, ফর্ম ৬ এবং SIR-এর জন্য দেওয়া প্রি-ফিল্ড এনুমারেশন ফর্মে এমন কিছু ঘোষণা করতে হয়, যা ঠিকানা পরিবর্তন করা পুরনো ভোটারের ক্ষেত্রে সত্য নয়। তাই তাঁদের দিয়ে ওই ফর্ম পূরণ করানোর অর্থ কার্যত মিথ্যা ঘোষণা দিতে বাধ্য করা।
কেন ফর্ম ৬ পূরণ করতে আপত্তি আদালতের?
আদালত স্পষ্ট করে দিয়েছে, ফর্ম ৬ এবং ফর্ম ৮-এর উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। ফর্ম ৬: যাঁরা প্রথমবার ভোটার তালিকায় নাম তুলতে চান এবং আগে কোনও বিধানসভা বা লোকসভা কেন্দ্রের ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম নেই, তাঁদের জন্য এই ফর্ম। আর ফর্ম ৮: যাঁদের নাম আগে থেকেই ভোটার তালিকায় রয়েছে, কিন্তু বাসস্থান পরিবর্তনের কারণে ঠিকানা বদল করতে চান, তাঁদের জন্য এই ফর্ম।
বিচারপতিদের বক্তব্য, কোনও পুরনো ভোটার যদি ঠিকানা পরিবর্তনের পর ফর্ম ৬ পূরণ করেন, তা হলে তাঁকে ঘোষণা করতে হবে যে এর আগে কোনও ভোটার তালিকাতেই তাঁর নাম ছিল না। অথচ বাস্তবে তাঁর নাম আগে থেকেই ভোটার তালিকায় রয়েছে। ফলে এই ঘোষণা মিথ্যা হবে।
একই সমস্যা রয়েছে SIR-এর প্রি-ফিল্ড এনুমারেশন ফর্মেও। কারণ, ওই ফর্মে ভোটারকে ঘোষণা করতে হয় যে তিনি ফর্মে উল্লেখ করা আগের ঠিকানাতেই বসবাস করছেন। কিন্তু যিনি ইতিমধ্যে অন্যত্র চলে গিয়েছেন, তাঁর পক্ষে এই ঘোষণা করাও সম্ভব নয়।
আদালত জানিয়েছে, এই ধরনের ভুল বা মিথ্যা ঘোষণা করলে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৩১ নম্বর ধারায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
কী ঘটেছিল মামলায়?
মামলাকারী ছিলেন গোয়ার সালগাঁওকর পরিবারের ছয় সদস্য। ১৯৯৫ সাল থেকে তাঁরা গোয়ার সান্তা ক্রুজ বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটার। আগে তাঁদের নাম ছিল ওই কেন্দ্রের ২৯ নম্বর পার্টে। কিন্তু ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে SIR প্রক্রিয়া শুরুর আগে তাঁরা একই বিধানসভা কেন্দ্রের অন্য একটি এলাকায় চলে যান। নতুন ঠিকানা ছিল ২৫ নম্বর পার্টে।
এরপর পুরনো ঠিকানায় এনুমারেশন ফর্ম দিতে গিয়ে বুথ লেভেল অফিসার (BLO) জানতে পারেন, ওই পরিবার আর সেখানে থাকেন না। পরে পরিবারের সদস্যরা নতুন ঠিকানায় গিয়ে ভোটার তালিকায় ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য ফর্ম ৮ জমা দিতে চান। কিন্তু নির্বাচন আধিকারিকরা তাঁদের এনুমারেশন ফর্ম জমা না দেওয়ার কারণ দেখিয়ে আবেদন গ্রহণ করেননি। উল্টে তাঁদের ফর্ম ৬ জমা দিতে বলা হয়।
এরপরই আদালতের দ্বারস্থ হন ওই ছয় সদস্য। তাঁদের বক্তব্য ছিল, তাঁরা নতুন ভোটার নন। আগে থেকেই ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে। তাই ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য ফর্ম ৮ জমা দেওয়ার অধিকার তাঁদের রয়েছে।
মামলার শুনানিতে বম্বে হাইকোর্ট জানায়, SIR চললেও ভোটার তালিকায় নাম সংশোধন বা ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট আইনি বিধানগুলি কার্যকর থাকে। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের অজুহাতে নির্বাচন কমিশন সেই নিয়ম স্থগিত রাখতে পারে না। ফলে কোনও ভোটার ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য ফর্ম ৮ জমা দিলে নির্বাচন আধিকারিকদের তা বিবেচনা করতেই হবে।
আদালত আরও জানায়, কারও নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার আগে তাঁকে নিজের বক্তব্য জানানোর যুক্তিসঙ্গত সুযোগ দিতে হবে। যথাযথ শুনানি ছাড়া নাম বাদ দেওয়া হলে তা নাগরিকের ভোটাধিকার খর্ব করার সামিল। শেষ পর্যন্ত আদালত নির্বাচন আধিকারিককে ওই ছয় আবেদনকারীর নাম ভোটার তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে।
আদালতের এই রায় SIR প্রক্রিয়ায় ঠিকানা পরিবর্তন করা ভোটারদের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ, আগে থেকেই ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে এমন কেউ শুধু বাসস্থান বদলানোর কারণে নতুন ভোটার হয়ে যান না। তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ফর্ম ৮, ফর্ম ৬ নয়।