Fundamental Duties: নিজের অধিকার জানেন, সংবিধানে থাকা ১১টি মৌলিক কর্তব্য জানেন কি?
11 Fundamental Duties of Indian Citizens: কোনও নাগরিক যদি নিজের অধিকার নিয়ে সরব হন, অথচ নিজের কর্তব্যের বিষয়ে একেবারেই চিন্তা না করেন, তা হলে তিনি কোনও আইন ভাঙছেন না। কিন্তু সংবিধানে তাঁর সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তার অর্ধেকটাই তিনি পড়ছেন। একজন ভারতীয়র মৌলিক কর্তব্য কী কী? লিখেছেন সন্তোষ নায়ার।

নয়াদিল্লি: বেশিরভাগ ভারতীয়কে যদি মৌলিক অধিকারের বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হয়, তা হলে তাঁরা দ্রুত উত্তর দেবেন। বাকস্বাধীনতা, সাম্যের অধিকার, মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার। কিন্তু সেই একই ব্যক্তিকে যদি মৌলিক কর্তব্য কী জিজ্ঞাসা করা হয়? সাধারণত এর পর যে নীরবতা নেমে আসে, তা লক্ষ করার মতো। সংবিধান নাগরিকদের কী কী অধিকার দিয়েছে, তা তাঁরা যত সহজে বলতে পারেন, তার বিনিময়ে সংবিধান তাঁদের কাছে কী প্রত্যাশা করে, তা বলতে পারেন না।
অথচ এই কর্তব্যগুলিও সংবিধানেই লেখা রয়েছে। সংবিধানের ৫১এ অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে মৌলিক কর্তব্যের। বর্তমানে এই কর্তব্যের সংখ্যা ১১। সংবিধান, জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতকে সম্মান জানানো। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল যে আদর্শগুলি, সেগুলিকে লালন করা। দেশের সার্বভৌমত্ব ও ঐক্য রক্ষা করা। ধর্ম ও অঞ্চল নির্বিশেষে সব ভারতীয়ের মধ্যে সম্প্রীতি গড়ে তোলা। দেশের যৌথ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা। বন, হ্রদ, নদী ও বন্যপ্রাণী রক্ষা করা। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ও অনুসন্ধিৎসার মানসিকতা গড়ে তোলা। সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা এবং হিংসা থেকে দূরে থাকা। নিজের কাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করা। এর পাশাপাশি, পরবর্তীকালে যুক্ত হয়েছে আরও একটি কর্তব্য—ছয় থেকে চোদ্দো বছর বয়সি প্রতিটি শিশু যাতে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়, তা নিশ্চিত করা।
সংবিধানে কখন যুক্ত হয় মৌলিক কর্তব্য?
১৯৫০ সালে গৃহীত মূল সংবিধানে এই কর্তব্যগুলি ছিল না। ১৯৭৬ সালে ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে এগুলি যুক্ত করা হয়। সর্দার শরণ সিংয়ের নেতৃত্বাধীন একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এই পদক্ষেপ করা হয়েছিল।
এখানে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানা প্রয়োজন। ১৯৭৬ সালে দেশে জারি ছিল জরুরি অবস্থা বা এমার্জেন্সি। সেই সময় বেশ কয়েকটি মৌলিক অধিকারও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছিল। অর্থাৎ, নাগরিকদের কর্তব্যের তালিকা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন গণতন্ত্রের ইতিহাসে অধিকার ও কর্তব্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অধিকারই সবচেয়ে বেশি চাপে ছিল।
এর অনেক পরে, ২০০২ সালে, শিশুদের শিক্ষার বিষয়ে আরও একটি মৌলিক কর্তব্য সংবিধানে যুক্ত হয়।
এবার এমন একটি বিষয়, যা জানার পর অনেকেই অবাক হন। মৌলিক অধিকারের মতো মৌলিক কর্তব্য সরাসরি আদালতের মাধ্যমে বলবৎ করা যায় না। স্বাধীনতা সংগ্রামের আদর্শকে যথাযথভাবে লালন না করা কিংবা কারও মধ্যে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকার কারণে তাঁকে গ্রেফতার করা যায় না। এই কর্তব্যগুলিকে নৈতিক ও নাগরিক অঙ্গীকার হিসেবে সংবিধানে রাখা হয়েছে, অপরাধ হিসেবে নয়।
তবে এর অর্থ এই নয় যে, এগুলি নিছক কিছু কথার সমষ্টি। একাধিক ক্ষেত্রে ভারতীয় আদালত অন্যান্য আইন ব্যাখ্যা করার সময় মৌলিক কর্তব্যের সাহায্য নিয়েছে। বিশেষ করে পরিবেশ ও সরকারি সম্পত্তি রক্ষার ক্ষেত্রে এই কর্তব্যগুলিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আদালত এগুলিকে এমন এক সাংবিধানিক চেতনার নির্দেশিকা হিসেবে দেখেছে, যা নাগরিকদের আচরণে প্রতিফলিত হওয়া প্রত্যাশিত—যদিও আইন করে সব ক্ষেত্রে তা বাধ্যতামূলক করা যায় না।
যে দেশে বাস করেন, সেই দেশের প্রতি নাগরিকদের কী কর্তব্য রয়েছে?
দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি একবার ভাবুন। অধিকার সাধারণত এই প্রশ্নের উত্তর দেয়—রাষ্ট্র বা অন্যদের কাছে আমি কী দাবি করতে পারি? অন্যদিকে, কর্তব্য নীরবে অন্য একটি প্রশ্ন তোলে—যে দেশে আমি বাস করি, সেই দেশের প্রতি আমার কী দায়িত্ব রয়েছে? শুধুমাত্র এই দেশের নাগরিক হওয়ার কারণেই আমার কী করা উচিত?
কোনও নাগরিক যদি নিজের অধিকার নিয়ে সরব হন, অথচ নিজের কর্তব্যের বিষয়ে একেবারেই চিন্তা না করেন, তা হলে তিনি কোনও আইন ভাঙছেন না। কিন্তু সংবিধানে তাঁর সম্পর্কে যা বলা হয়েছে, তার অর্ধেকটাই তিনি পড়ছেন।
ধরা যাক, একটি সাধারণ পার্ক, রেলস্টেশন বা বাসস্ট্যান্ডের কথা। সেই জায়গাগুলি পরিষ্কার রাখা, কোনও কিছু নষ্ট না করা কিংবা সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব অন্য কারও বলে ধরে না নেওয়া—এই কাজগুলির জন্য প্রতিটি জায়গায় কোনও পুলিশকর্মী পাহারায় থাকেন না। এই দায়িত্ব পালনের বিষয়টি অনেকটাই নির্ভর করে সংবিধানের ৫১এ অনুচ্ছেদে থাকা নীরব প্রত্যাশার উপর। প্রত্যাশা, নাগরিকরা নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে এই জায়গাগুলির যত্ন নেবেন।
আইন করে বলবৎ করা যায় না, তা হলে কি কর্তব্যের গুরুত্ব নেই?
এর অর্থ এই নয় যে মৌলিক কর্তব্যগুলিকে মৌলিক অধিকারের মতোই বলবৎ করতে হবে কিংবা নাগরিক জীবনের প্রতিটি ছোটখাটো ব্যর্থতাকে আইনি অপরাধে পরিণত করতে হবে। যথেষ্ট কারণেই গণতন্ত্রে সাধারণত এমন পদক্ষেপ এড়িয়ে চলা হয়।
কিন্তু কোনও বিষয়কে আইন করে বাধ্যতামূলক করা যায় না, আর কোনও বিষয় গুরুত্বহীন—এই দু’টি এক কথা নয়।
একটি দেশ শুধু আইন দিয়ে চলে না, নাগরিকদের অভ্যাস ও আচরণের উপরও তার অনেক কিছু নির্ভর করে। আর সেই অভ্যাস গড়ে ওঠে মূলত নাগরিকদের নিজেদের সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। কেউ দেখছেন না, আদালতে প্রমাণ করারও কোনও উপায় নেই—তা সত্ত্বেও নাগরিকরা বারবার নিজেদের আচরণের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করেন যে এই কর্তব্যগুলির গুরুত্ব রয়েছে।
পরের বার নিজের কোনও অধিকার প্রয়োগ করার সময়, যে অধিকারটি আপনার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তখন এক মুহূর্ত থেমে আরও একটি প্রশ্ন ভাবতে পারেন। সংবিধানের সেই একই পাতায় এমন একটি কর্তব্যের কথাও লেখা রয়েছে, যা আপনার কাছে কিছু প্রত্যাশা করে। আপনি কি জানেন, সেই কর্তব্যটি কী?
তথ্যসূত্র: ভারতের সংবিধানের চতুর্থ-ক অংশের ৫১এ অনুচ্ছেদ; ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংবিধান সংশোধনী আইন ও শরণ সিং কমিটির সুপারিশ; ২০০২ সালের ৮৬তম সংবিধান সংশোধনী আইন, যার মাধ্যমে শিশুদের শিক্ষার বিষয়ে একাদশতম মৌলিক কর্তব্যটি যুক্ত করা হয়।
