
নয়া দিল্লি: দেশের বিভিন্ন খাতের পরিকাঠামো উন্নয়নকে একই ছাতার তলায় এনে সমন্বিত ও গতিশীল করার লক্ষ্যে চালু হয়েছিল ‘পিএম গতিশক্তি জাতীয় মাস্টার প্ল্যান’। তা সাফল্যের সঙ্গে পাঁচ বছর পূর্ণ করল। ২০২১ সালের ১৩ অক্টোবর চালু হয় এই উদ্যোগ। সড়ক, রেলপথ, বন্দর, বিমানবন্দর, জলপথ এবং পাওয়ার গ্রিডের মতো বিচ্ছিন্ন পরিকাঠামোগুলিকে একত্রিত করে ভারতের পরিকল্পনা ব্যবস্থায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।
পিএম গতিশক্তি ব্যবস্থাটি মূলত ৬টি মূল নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে— সমন্বিত উন্নয়ন (Integrated Development), বহুমুখী যোগাযোগ বা মাল্টিমোডাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার, শেষ প্রান্ত পর্যন্ত সংযোগ (Last-mile connectivity), দ্রুত জমি অধিগ্রহণ, দ্রুত পরিবেশ ও অন্যান্য ছাড়পত্র প্রদান এবং পরিবেশগত প্রভাব সর্বনিম্ন রাখা।
সাতটি মূল ইঞ্জিন: সড়ক, রেলপথ, বিমানবন্দর, বন্দর, জলপথ, গণপরিবহন এবং লজিস্টিকস ইনফ্রাস্ট্রাকচার— এই সাতটি খাতকে এই রূপরেখার মূল চালিকাশক্তি হিসাবে ধরা হয়েছে।
‘হোল-অফ-গভর্নমেন্ট’ দৃষ্টিভঙ্গি: এই প্ল্যাটফর্মে ৫৮টি কেন্দ্রীয় মন্ত্রক ও দপ্তর এবং দেশের ৩৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে যুক্ত করা হয়েছে।
জিআইএস (GIS) ভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম: এটি একটি ভৌগোলিক তথ্যভিত্তিক ডিজিটাল মাস্টার প্ল্যান, যেখানে কাঠামো, অর্থনীতি ও ভৌগোলিক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৬ সালের অক্টোবর মাসের হিসাব অনুযায়ী, এই প্ল্যাটফর্মে ২৩,৪৯৩টিরও বেশি ডেটা লেয়ার এবং ২৩০টিরও বেশি অনুমোদিত সাইট ডেটাসেট রয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি দক্ষ তিন-স্তরের প্রশাসনিক কাঠামো কাজ করছে: ১. ১.এম্পাওয়ার্ড গ্রুপ অফ সেক্রেটারিজ (EGoS): ক্যাবিনেট সচিবের নেতৃত্বে এটি মাস্টার প্ল্যানের বাস্তবায়ন ও পর্যালোচনা করে।
২. নেটওয়ার্ক প্ল্যানিং গ্রুপ (NPG): বিভিন্ন মন্ত্রকের পরিকল্পনা বিভাগের প্রধানদের নিয়ে গঠিত এই গ্রুপ বিভিন্ন প্রকল্পের উপযোগিতা যাচাই ও সমন্বয় নিশ্চিত করে।
৩. টেকনিক্যাল সাপোর্ট ইউনিট (TSU): এটি বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি প্রযুক্তিগত সহায়তা দল।
প্রকল্পের অগ্রগতি: ২০২৬ সালের অগাস্ট মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নেটওয়ার্ক প্ল্যানিং গ্রুপ (NPG) প্রায় ১৮.৬৬ লক্ষ কোটি টাকার মোট ৩৯৬টি বড় পরিকাঠামো প্রকল্প মূল্যায়ন করেছে। এর মধ্যে ২৫৬টি প্রকল্প ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে এবং ১৯৮টি প্রকল্পের কাজ বর্তমানে দ্রুতগতিতে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘গতিশক্তি বিশ্ববিদ্যায়লয়’ (GSV) পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতে ভারতের প্রথম বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানটি লজিস্টিকস ও পরিকাঠামো পরিকল্পনার ওপর শিক্ষা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করে। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে পিএম গতিশক্তির অধীনে ২.৪ লক্ষেরও বেশি সরকারি কর্মকর্তাকে আধুনিক পরিকাঠামো পরিকল্পনার ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এই প্ল্যানের মাধ্যমে বস্ত্র শিল্প, ফার্মাসিউটিক্যালস, প্রতিরক্ষা করিডোর, মেগা ফুড পার্ক এবং কৃষি অঞ্চলগুলির মতো অর্থনৈতিক জোনগুলিকে সরাসরি লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত করা হচ্ছে।
বিহারের খাগড়িয়া-পূর্ণিয়া করিডোর সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে পিএম গতিশক্তি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাঁচটি প্রধান অর্থনৈতিক নোড (যেমন textile clusters, Mega Food Parks) এবং ১১টি লজিস্টিকস নোডকে সরাসরি জাতীয় সড়কের সাথে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুটোই বাঁচাচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ডিজিটাল ভৌগোলিক তথ্য ও আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে তৈরি এই পিএম গতিশক্তি জাতীয় মাস্টার প্ল্যান ভারতকে বিশ্বের দ্রুততম ও সুসংহত পরিকাঠামোর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।