CEC: ১০ মাসে ১৪ বার! ‘ঘরের লোকের’ কাছে প্রশ্নের মুখে CEC জ্ঞানেশ কুমার?

Gyanesh Kumar 14 Objections: 'স্পেশাল ইন্টেন্সিভ রিভিশন' অর্থাৎ SIR! ২০২৫ সালের জুনে বিহারে শুরু হয়েছিল SIR। লক্ষ্য ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন। এটি ইতিমধ্যেই ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দিয়েছে। কারা ভোট দেওয়ার অধিকার পাবেন আর কারা পাবেন না—তা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখন বিতর্কের মাঝে।

CEC: ১০ মাসে ১৪ বার! ঘরের লোকের কাছে প্রশ্নের মুখে CEC জ্ঞানেশ কুমার?
CECর ডান দিকে, কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বাঁ দিকে কমিশনার বিবেক জোশীImage Credit source: TV9 Network

Sep 23, 2026 | 2:01 PM

নয়াদিল্লি: SIR নিয়ে বিরোধীরা তাঁকে নিশানা করছেন। এরই মধ্যে বড় বিতর্কে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। গত ১০ মাসের মধ্যে অন্ততপক্ষে ১৪ বার! ‘ঘরেই’ মুখে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন জ্ঞানেশ কুমার। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একই দিনে নাকি চার বার প্রশ্ন তুলেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী। উল্লেখ্য, সুখবিন্দর সিং সান্ধু ১৯৮৮ সালের উত্তরাখণ্ডের IAS ব্যাচ। অন্যদিকে, বিবেক যোশী ১৯৮৯ সালের হরিয়ানার IAS ব্যাচ।

কোথায় সমস্যা? কেন জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আপত্তি তুললেন বাকি দুই কমিশনার? 

নেপথ্যে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ অর্থাৎ SIR। ২০২৫ সালের জুনে বিহারে শুরু হয়েছিল SIR। লক্ষ্য ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন। এটি ইতিমধ্যেই ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটিরও বেশি নাম বাদ দিয়েছে। কারা ভোট দেওয়ার অধিকার পাবেন আর কারা পাবেন না—তা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখন বিতর্কের মাঝে।

‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর একটি রিপোর্টে উঠে এসেছে, এই একই সময়কালে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিশনের অন্দরেই ঠিক এই নির্দিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। আর এই প্রশ্ন তুলেছেন স্বয়ং তিন কমিশনারের মধ্যে দু’জন—সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক জোশী।

দেশজুড়ে SIR প্রক্রিয়া চালু করার বিষয়টির তদারকিতে এই তিনজন কমিশনারই ছিলেন। কিন্তু প্রতিবেদন বলছে, সান্ধু ও জোশী লিখিতভাবে গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছেন—যার মধ্যে একই দিনে চারবার আপত্তি জানানো হয়েছিল। তাঁরা আরও বিস্ফোরক দাবি করেছেন। তাঁদের দাবি, এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে এবং নির্দেশ জারি করা হয়েছে তাঁদের অজান্তেই।

দুই কমিশনারের আপত্তির মূল কারণ

১. ‘নতুন ভোটার’ কে? এবং কেন ফর্ম 6 পরিবর্তন করা হয়েছিল?

নির্বাচন কমিশনার বিবেক জোশী ও সুখবীর সিং সান্ধু লিখিতভাবে জানান যে, ১৯৬০ সালের ‘রেজিস্ট্রেশন অব ইলেক্টরস রুলস’ অনুযায়ী ফর্ম ৬ একটি সংবিধিবদ্ধ বা আইনি ফর্ম। আইন মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন ছাড়া এটি পরিবর্তন করা যায় না। এই পরিবর্তনকে তাঁরা বেআইনি বলে উল্লেখ করেছিলেন।

২. ভোটার তালিকায় কাদের প্রবেশাধিকার?

গত এক বছরে এই ডিজিটাল সিস্টেমের অর্থাৎ ERONet/ECINet- এর নিয়ন্ত্রণ দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি আধিকারিকদের হাত থেকে সরিয়ে দিল্লির কেন্দ্রীয় টিমকে দেওয়া হয়। তাতে আপত্তি জানিয়েছিলেন দুই কমিশনার। তাঁদের বক্তব্য, দিল্লিতে তথ্য নিয়ন্ত্রণের ‘কেন্দ্রীয়করণ’ কমিশনের স্বচ্ছতাকে নষ্ট করে।

৩. আপিল দায়ের করার অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন

পশ্চিমবঙ্গে SIR প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়ার পর বহু ভোটার আইনি ট্রাইব্যুনালের দ্বারস্থ হন। বিচারে বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা ১৬ লক্ষেরও বেশি ভোটারের নাম পুনরায় তালিকায় যুক্ত করার নির্দেশ দেন। কমিশনার সান্ধু প্রশ্ন তুলেছিলেন, নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে এই আপিল দায়ের করার অনুমতি কে দিয়েছিল? তাঁরা দুজনে কিন্তু এ বিষয়ে কিছুই জানতেন না।

৪. সফটওয়্যার কেন যোগ্য ভোটারদের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছিল?

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুসারে, গোয়ায় যেসব ভোটারের তথ্যে অমিল অর্থাৎ লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি পাওয়া গিয়েছিল, তাঁদের ইআরও -দের সামনে নিজেদের নথি জমা দিয়ে শুনানি পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। নথিপত্র যাচাইয়ের পর স্থানীয় ইআরও-রা ৯৭ জন ভোটারকে সম্পূর্ণ যোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তাঁদের নাম অন্তর্ভুক্ত করার আদেশ দেন। কিন্তু কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যারে ইআরও-দের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা বা আগের আদেশ বাতিল করার ‘Rollback’ অপশন রাখা হয়নি। গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তার দফতর থেকে ৮ বার দিল্লিতে আইটি প্রধান ও ঊর্ধ্বতন ডেপুটি নির্বাচন কমিশনারের কাছে চিঠি লিখে সফটওয়্যারে এই ফিচারটি চালু করার আবেদন জানানো হয়। কিন্তু কোন উত্তর বা সমাধান মেলেনি, ফলে চূড়ান্ত সময়সীমা পার হয়ে যায় এবং ওই ৯৭ জন যোগ্য ভোটার তালিকা থেকে সম্পূর্ণ বাদ পড়ে যান, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সান্ধু।

সান্ধু অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন দুই কমিশনারের লিখিত পরামর্শের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করেছে। কমিশনের এই পদক্ষেপকে ‘অননুমোদিত ও বেআইনি’ বলে দাবি করেছেন তিনি। দুই কমিশনার তাঁদের আপত্তিগুলোর বিষয়ে জ্ঞানেশ কুমারকেও জানিয়েছিলেন। ক্যাবিনেটের সচিবকে জানানো সমস্ত আপত্তি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকেও জানানো হয়। পাশাপাশি চিঠির অনুলিপি উপ-নির্বাচন কমিশনারদের কাছেও পাঠানো হয়েছিল।

উল্লেখ্য,  জাতীয় নির্বাচন কমিশনের তিন জন কমিশনার থাকে। প্রথম জন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও বাকি দুজন নির্বাচন কমিশনার হিসাবে কাজ করেন।  তিন জনই সম মর্যাদা ও সম ক্ষমতাসম্পন্ন। জাতীয় নির্বাচন কমিশনে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তিন জনের মধ্যে অন্ততপক্ষে দু’জনকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত দিতে হয়। এক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যাচ্ছে, বাংলার ক্ষেত্রে যে ১৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য আবেদন এসেছে, সেই তথ্য স্পষ্ট নয়। যা নিয়ে সান্ধু ও যোশী প্রশ্ন তুলেছিলেন। ক্যাবিনেটের সচিবকেও তাঁরা এ বিষয়ে জানিয়েছিলেন, যে এই নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে না। গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও দুই নির্বাচন কমিশনার এক বৈঠকে বসেন।

জ্ঞানেশ কুমারের সাসপেনশনের দাবি

এই প্রতিবেদনকে হাতিয়ার করেই এখন জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে সরব বিরোধীরা। অখিলেশ যাদব সামাজিক মাধ্যমে ওই প্রতিবেদনের একটি পোস্ট শেয়ার করেন। আইনজীবী কপিল সিব্বল, যিনি সুপ্রিম কোর্টে মমতার করা এসআইআর মামলার সওয়াল করেছিলেন, তিনি বললেন, “আজ বোঝা যাচ্ছে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে ছিলেন না। তিনি তাঁর ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নিতেন। বাকি দুই কমিশনার বিরোধিতা করেছিলেন। ১০ মাসে ১৪ বার বাধা দিয়েছিলেন তাঁরা।” জ্ঞানেশ কুমারকে সাসপেন্ড করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।

সরব বিরোধীরা

তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায় বলেন, “এটা কখনই মান্যতা পায় না। তবে এটাই ভালো যে বাকি দুই কমিশনার বিরোধিতা করেছিলেন। আমরা ইতিমধ্যেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের ইমপিচমেন্টের দাবিতে সংসদে পিটিশন দিয়েছি। এটা গৃহীত হবে নিশ্চয়ই।”

NCP সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে বলেন, “আমাদের প্রত্যেককে এখন এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। আসলে কষ্ট করে পরীক্ষায় পাশ করার আলাদাই মজা রয়েছে। অনুকরণ করে, টুকলি করে পাশ করার তো কোনও মানে নেই। মমতাদি হোক কিংবা আমরা, সকলেই তো ভিক্টিম!”

কী বলছে বিজেপি?

রাজ্য বিজেপির মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার বলেন, “সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবর, একটা অসমর্থিত সূত্রের খবর। যতক্ষণ দুই কমিশনার কোটেশন দিচ্ছেন, আমরা মেনে নিচ্ছি না।”

প্রাক্তন নির্বাচন কমিশনার ও পি রাওয়াত বলেন, “নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব সুষ্ঠ, অবাধ ও ভয়ভীতিমুক্ত পরিবেশে নির্বাচন করার। কিন্তু এসআইআর-এর মাধ্যমে এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, ভোটারদের মনে ভয় তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এটা গণতন্ত্রের জন্য দুর্ভাগ্যজনক। আরও ভালো হত, যদি বাকি ২ কমিশনার বিরোধিতার জন্য ১০ মাস অপেক্ষা না করতেন।”

Loading...
Unable to load recommendations.
Follow Us