
নয়া দিল্লি: আইপ্যাক মামলায় আজ বুধবারই বড় পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি পি কে মিশ্র। বলেছেন, মুখ্যমন্ত্রী কোনও কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তে ঢুকে পড়লে গণতন্ত্র প্রশ্নের মুখে পড়ে যায়। আর বৃহস্পতিবার সেই মামলায় সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা বোঝালেন কীভাবে ইডি-র মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। অভিযুক্তকে কেন রক্ষা করার চেষ্টা হল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তুষার মেহতা।
আইপ্যাক অফিসে ইডি তল্লাশি চলার সময় পৌঁছে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হাতে সবুজ ফাইল নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি। সেই ঘটনা থেকেই মামলার সূত্রপাত। মামলায় ইডি-র এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে রাজ্যের তরফে। সেই ইস্যুতেই বৃহস্পতিবার সওয়াল করেন সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা।
তুষার মেহতার সওয়াল, “পশ্চিমবঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। কেউ এই বক্তব্য পছন্দ করতে পারেন বা নাও করতে পারেন, কিন্তু এটাই আমার আইনি সওয়াল। Rule of law আর্টিকল ১৪-র অধীনে থাকে, যা মৌলিক অধিকার হিসেবে পরিচিত। কীভাবে সেই মৌলিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে, সেটাই আমি দেখাবো এবং কেন এই আবেদন আইনিভাবে বৈধ তা প্রমাণ করব।”
সলিসিটর জেনারেল জানান, কয়লা কেলেঙ্কারিতে ২৭০০ কোটি টাকার তছরুপের মামলা দায়ের হয়েছে। ইডি তার তদন্ত করছে। ইডি অফিসাররাও এই দেশের নাগরিক বলে উল্লেখ করে তুষার মেহতা বলেন, “তাঁরা তাদের অফিশিয়াল দায়িত্ব পালন করছেন। তদন্তে কী উঠে এসেছে, তারা তা কোর্টের সামনে রাখছে এবং কোর্টের কাছে আবেদন জানাচ্ছে, তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হোক এবং তাদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা হোক।” তাঁর অভিযোগ, “বেআইনি কয়লা পাচারের টাকা আন্তর্দেশীয় হাওয়ালা মারফত গোয়ায় গিয়েছে। সেখানে তা নগদে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এরপর সেই টাকা গিয়েছে আইপ্যাকে।”
তুষার মেহতার অভিযোগ, “মুখ্যমন্ত্রী এমন কিছু ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে গিয়েছেন, যা তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারত। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া হলফনামায় স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে, ইডি অফিসারদের তরফে তদন্তে হস্তক্ষেপ না করার বারবার আবেদন জানানো সত্ত্বেও তারা জোর করে তদন্তস্থলে ঢোকেন এবং গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এবং ডিজিটাল ডিভাইস নিয়ে চলে যান।” তিনি বলেন, “এরপর অফিসারদের বিরুদ্ধে এই এফআইআর করা হয়। সেই এফআইআরকে চ্যালেঞ্জ করেই আমরা কোর্টে এসেছি। আমরা নিরপেক্ষ এজেন্সির মারফত তদন্ত চাইছি।”
সিসিটিভি ক্যামেরার স্টোরেজ ডিভাইস পুলিশ নিয়ে গিয়েছে, আইপ্যাক এর কর্মীদের মোবাইল পর্যন্ত নিয়ে গিয়ছে বলেও অভিযোগ। তুষার মেহতা বলেন, “যে ব্যক্তি ক্রিমিনাল সিন্ডিকেটের অংশ, যে নিজে তদন্তের আতস কাঁচের নিচে রয়েছে, তাকে কীভাবে রক্ষা করার চেষ্টা হচ্ছে দেখুন।”
আইপ্যাক মামলায় হাইকোর্টে কী হয়েছে, সেটাও উল্লেখ করেন তুষার মেহতা। তিনি বলেন, শুনানি শুরু হওয়ার আগেই পশ্চিমবঙ্গের শাসক দল হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের মাধ্যমে লোক জড় করে কোর্টরুমের ভিতরে অশান্তি সৃষ্টি করেছে।
মামলার বৈধতার সঙ্গে এই ঘটনার কি যোগ রয়েছে তা জিজ্ঞেস করলেন বিচারপতি পি কে মিশ্র।
তুষার মেহতা বলেন, “ওরা আইনি সওয়ালে বলার চেষ্টা করছে, আমাদের হাইকোর্টে যাওয়া উচিত। কিন্তু কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে এমন কিছু অর্ডার দিতে হয়েছিল, কারণ আমার এক লারনেট ফ্রেন্ডের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়েছিল। সেই মন্তব্য ভাইরাল করা হয়েছিল। আমরা প্রথমেই সুপ্রিম কোর্টে আসতে চাইনি। হাইকোর্টের শুনানিতেই বলা হয়েছে, শুনানির যথার্থ পরিবেশ নেই। মুখ্যমন্ত্রীর জোর করে ঢুকে পড়া কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।”
তুষার মেহতার বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের মতো এত সুন্দর একটা রাজ্য। যে জায়গা দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত ছিল। তার আজ কী পরিস্থিতি!
কলকাতা প্রাক্তন পুলিশ কমিশনারের বাড়িতে সিবিআই অভিযানের সময় মুখ্যমন্ত্রী কী ঘটিয়েছিলেন, তার বর্ণনা দেন তুষার মেহতা। সিবিআই-এর রিজিওনাল অফিসে মুখ্যমন্ত্রী ঢুকে যাওয়া এবং সিবিআই অফিসে পাথর ছোড়ার ঘটনার উল্লেখ। সিবিআই জয়েন্ট ডিরেক্টরের বাড়িতে কীভাবে হামলা হয়েছিল, তা তুলে ধরেন। বলেন, “সেই পুলিশ কমিশনার পরে রাজ্যসভার সাংসদ হয়েছেন।”
আরও বলেন, “কোর্টের অর্ডারে একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছিল। মুখ্যমন্ত্রী ৫০০০ লোক নিয়ে কোর্টরুমে ঢুকে যান। জজ যাতে নিরপেক্ষভাবে নির্দেশ দিতে না পারেন, তার জন্য পরোক্ষে চাপ তৈরি করেন।”
গত জানুয়ারি মাসে আইপ্যাক অফিসের তল্লাশির পর এই মামলা হয়। সুপ্রিম কোর্টে চলছে শুনানি। বুধবারের পর বৃহস্পতিবারও ছিল শুনানি। সলিসিটর জেনারেল একের পর এক অভিযোগ করেন এদিন। প্রথমার্ধে সওয়াল শেষ করেন তুষার মেহতা।