
ইম্ফল: ৩ মে থেকে মণিপুরে লাগাতার হিংসা চলছে। কোনওভাবেই এই হিংসা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। রাজ্যের পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে মণিপুরে এসেছে বিরোধীদের ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রতিনিধি দল। এই অবস্থায় কুকি সম্প্রদায়ের নেতা তথা বিজেপি বিধায়ক পাওলেনলাল হাওকিপ রাজ্যকে তিনটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ভেঙে দেওয়ার দাবি জানালেন। তাঁর মতে, এতেই মণিপুরের সংঘাতের সমাধান হতে পারে। পিটিআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে হাওকিপ বলেছেন, রাজ্যে জাতির ভিত্তিতে যে ভাগ রয়েছে, তাকে ‘রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বীকৃতি’ দেওয়া উচিত। এর আগে কুকি সম্প্রদায়ের নেতারা কুকি অধ্যুষিত অঞ্চলগুলির জন্য ‘পৃথক প্রশাসন’-এর দাবি তুলেছিলেন। মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিং এবং ইম্ফলের বেশ কয়েকটি মেইতেই সংগঠন রাজ্য ভাগের বিষয়ে যে কোনও পদক্ষেপের কঠোর বিরোধিতা জানিয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার, কুকি ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন এবং ইউনাইটেড পিপলস ফ্রন্টও রাজ্যভাগের বিরুদ্ধে।
তবে, পিটিআই-কে হাওকিপ বলেছেন, “আমার মতে, মণিপুরের জাতিগত বিভেদকে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্বীকৃতি দেওয়া উচিত। আগামিদিনে তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হিসাবে মণিপুর রাজ্যকে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন।” রাজ্যের প্রধান তিন জনগোষ্ঠী – নাগা, কুকি এবং মেইতেইদের জন্য তিনটি পৃথক অঞ্চল তৈরির প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। তাঁর দাবি, এই ধরনের পদক্ষেপেই রাজ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আসতে পারে। একইসঙ্গে প্রতিটি সম্প্রদায়ের সমানবাবে অগ্রগতি ঘটবে, বিকাশ ঘটবে। মণিপুরের জনসংখ্যার প্রায় ৫৩ শতাংশ মেইতেই সম্প্রদায়ের এবং তাদের বেশিরভাগই ইম্ফল উপত্যকায় বাস করেন। অন্যদিকে, রাজ্যের ৪০ শতাংশ জনগণ নাগা এবং কুকি সম্প্রদায়ের। তারা প্রধানত পার্বত্য জেলাগুলিতে বসবাস করে। তবে, রাজ্যের বহু জেলাতেই তিন গোষ্ঠীর জনগণ মিলেমিশে থাকেন বলে, এই পদক্ষেপ করা কঠিন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
মণিপুরের সবথেকে হিংসাধ্বস্ত জেলা চুরাচাঁদপুরের সাইকোট কেন্দ্র থেকে বিজেপির টিকিটে জয়ী হয়েছিলেন হাওকিপ। কেন্দ্রীয় সরকার যে কুকি বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে, তা ইতিবাচক উন্নয়ন বলে মনে করছেন তিনি। তবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইদের প্রতি রাজ্য সরকারের পক্ষপাত রয়েছে এবং বীরেন সিং সরকার অহংকারী মনোভাব নিয়ে চলছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। হাওকিপ এবং অন্যান্য কুকি নেতাদের মতে, রাজ্যের অধিকাংশ সম্পদ কুক্ষিগত করে রেখেছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইরা। মণিপুর বিধানসভার পার্বত্য অঞ্চল কমিটির মতো সংস্থাগুলিকে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না।
মেইতেইদের সংগঠনগুলি অবশ্য কেন্দ্রের সঙ্গে কুকিদের আলোচনার বিরুদ্ধে ইম্ফলে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। তাদের দাবি কুকিদের গোষ্ঠীগুলি আসলে ‘মাদক-সন্ত্রাসবাদী। কুকি গোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে আফিম চাষ এবং মায়ানমার থেকে অবৈধ উদ্বাস্তুদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ করেছে তারা। জেএনইউ-এর প্রাক্তন ছাত্র হাওকিপ অবশ্য এই দাবিগুলি উড়িয়ে দিয়েছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে কুকিদের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন তিনি। তিনি বলেছেন, “কুকিরা ব্রিটিশদের সঙ্গে সবচেয়ে দীর্ঘসময় যুদ্ধ করেছিল। ১৯১৭ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত অ্যাংলো-কুকি যুদ্ধ চলেছিল। ব্রিটিশ ঐতিহাসিকরা তাকে কুকি বিদ্রোহ বলেছিল। নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজেও কুকি সম্প্রদায়ের প্রচুর মানুষ অংশ নিয়েছিলেন।”