
নয়া দিল্লি: নির্বাচনের একেবারে শেষ পর্বে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে নিশানা করলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। সমাজের একটা বিশেষ অংশ এবং বিরোধীদের নিশানা করতে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ‘বিদ্বেষমূলক এবং অসংসদীয়’ ভাষা ব্য়বহার করতে শুরু করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন প্রাক্তন। শুধু প্রধানমন্ত্রীকে আক্রমণ করাই নয়, তিন পৃষ্ঠার এক খোলা চিঠিতে প্রবীণ কংগ্রেস নেতা গত এক দশকের মোদী শাসনের বিভিন্ন দিকের সমালোচনা করেছেন। অর্থনীতি তো আছেই, কৃষক আন্দোলন, আয়ের বৈষম্য, কর্মসংস্থানের অভাব, অগ্নিবীর প্রকল্পের মতো বিভিন্ন বিষয় নিয়েই মতামত ব্যক্ত করেছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে, লোকসভা নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্বের ভোট গ্রহণের আগে তাঁর আবেদন, “স্বৈরাচারী শাসনের আক্রমণ থেকে, আমাদের গণতন্ত্র এবং সংবিধানকে সুরক্ষিত করার জন্য চূড়ান্ত সুযোগের সর্বাধিক ব্যবহার করুন।”
প্রথমেই দেখা যাক, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কী বলছেন প্রাক্তন? মোদী জনসভায় বক্তৃতা দেওয়ার মর্যাদা হ্রাস করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন মনমোহন সিং। তিনি বলেছেন, “অতীতে কোনও প্রধানমন্ত্রী, সমাজের একটি নির্দিষ্ট অংশ বা বিরোধীদের নিশানা করে এই ধরনের বিদ্বেষমূলক, অসংসদীয়, এবং রুক্ষ শব্দ উচ্চারণ করেননি।” রাজস্থানের এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী মোদী দাবি করেছিলেন, কংগ্রেসে দেশের সম্পদ মুসলিমদের মধ্য়ে পুনঃবন্টনের পরিকল্পনা করেছে। নিজের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তিনি ইউপিএ সরকারের সময়, মনমোহন সিং-এর করা এক মন্তব্যের উল্লেখ করেছিলেন। এদিনের চিঠিতে মনমোহন সিং সাফ জানিয়েছেন, “কোনোদিন কোনও সম্প্রদায়ের মধ্যে ভেদাভেদ করিনি।”
অর্থনীতি বিষয়ে মনমোহন সিং বলেছেন, “বিমুদ্রাকরণ বিপর্যয়, ত্রুটিপূর্ণ জিএসটি এবং কোভিড মহামারীর সময়ের অব্যবস্থাপনার ফলে একটি শোচনীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ছয় থেকে সাত শতাংশ জিডিপি বৃদ্ধির প্রত্যাশাই নিউ নর্মাল হয়ে উঠেছে। বিজেপি সরকারের আমলে গড় জিডিপি বৃদ্ধি ছয় শতাংশের নীচে নেমে গিয়েছে। কংগ্রেস-ইউপিএ আমলে এটা ছিল প্রায় আট শতাংশ। অভূতপূর্ব বেকারত্ব এবং লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সামাজিক বৈষম্যকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করেছে।” মনমোহন সিং আরও দাবি করেছেন, ইউপিএ সরকার জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়িয়েছিল। অন্যদিকে, বিজেপির ‘দুঃশাসনে’র ফলে পারিবারিক সঞ্চয় গত ৪৭ বছরের মধ্যে সবথেকে নিম্ন স্তরে রয়েছে।
কৃষকদের বিক্ষোভের কথাও উল্লেখ করেছেন মনমোহন সিং। শেষ পর্যন্ত মোদী সরকার তিনটি বিতর্কিত আইন ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেও, তার আগে কৃষকদের লাঞ্চনা করেছিল সরকার বলে, অভিযোগ করেছেন মনমোহন। তিনি লিখেছেন, “যেন লাঠি এবং রাবার বুলেট যথেষ্ট নয়, সংসদের অন্দরে প্রধানমন্ত্রী আমাদের কৃষকদের ‘পরজীবী’ বলে লাঞ্ছিত করেছেন। মোদিজি ২০২২ সালের মধ্যে আমাদের কৃষকদের আয় দ্বিগুণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু, গত ১০ বছরে তাঁর নীতিগুলি কৃষকদের উপার্জন কমিয়েছে। কৃষকদের জাতীয় গড় মাসিক আয় দিন প্রতি ২৭ টাকা। যেখানে কৃষক প্রতি গড় ঋণ রয়েছে ২৭,০০০ টাকা।” ইউপিএ সরকার ৩.৭৩ কোটি কৃষকদের ৭২,০০০ কোটি টাকার ঋণ মকুব করেছিল, মনে করিয়ে দিয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে জানিয়েছেন, আজ কংগ্রেস এমএসপির জন্য একটি আইনি গ্যারান্টি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
আয় বৈষম্য এবং যুবকদের জন্য চাকরির কংগ্রেসি প্রতিশ্রুতির কথাও জানিয়েছেন তিনি। তিনি লিখেছেন, “আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি, চাকরির ক্যালেন্ডার অনুসারে ৩০ লাখ শূন্যপদ পূরণ করব। এই চাকরির অর্ধেক মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। আমরা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মামলাগুলির জন্য ফাস্ট-ট্র্যাক আদালত স্থাপন করব।” বিতর্কিত অগ্নিবীর প্রকল্প নিয়ে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, “বিজেপি সরকার আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর উপর এক অকল্পিত অগ্নিবীর প্রকল্প আরোপ করেছে। বিজেপি মনে করে দেশপ্রেম, সাহসিকতা এবং সেবার মূল্য মাত্র চার বছর। এতে বোঝা যায়, তাদের জাতীয়তাবাদ, ভুয়ো জাতীয়তাবাদ।”