
নয়া দিল্লি: অশোক সিংঘলের জন্মশতবর্ষে কলম ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi)। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP)-এর প্রাক্তন কার্যনির্বাহী সভাপতি এবং রাম জন্মভূমি আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন অশোক সিংঘল। সংগঠন গড়ে তোলা, হিন্দু সমাজের মধ্যে ঐক্য তৈরি, শিক্ষা ও সমাজসেবার প্রসার এবং রাম মন্দির আন্দোলনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্মরণ করে তাঁর জন্মশতবর্ষে একটি বিশেষ লেখা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে অশোক সিংঘলের জন্মশতবর্ষ উদযাপন শুরু হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবন ও ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন লেখার মাধ্যমে।
লেখার শুরুতেই একটি প্রাচীন হিন্দি প্রবাদ উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি লেখেন, “বৃক্ষ নিজের ফল ভোগ করে না, নদী নিজের জল সঞ্চয় করে না; তেমনি সাধুজনও পরের কল্যাণের জন্যই জীবন ধারণ করেন।” যার অর্থ- গাছ নিজের ফল নিজে খায় না, নদী নিজের জল নিজে জমিয়ে রাখে না। অন্যের উপকারের জন্যই তাদের অস্তিত্ব। প্রধানমন্ত্রী মোদীর কথায়, মানুষের কল্যাণে নিজের জীবন উৎসর্গ করার এই ভাবনাই অশোক সিংঘলের জীবনে বারবার দেখা গিয়েছিল।
মোদী জানিয়েছেন, অশোক সিংঘলের সঙ্গে তাঁর বহুবার দেখা ও কথা বলার সুযোগ হয়েছিল। ১৯৮১ সালে তিনি যখন তরুণ কর্মী হিসেবে সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছিলেন, তখন অশোক সিংঘলের কাছ থেকে হাতে লেখা একটি চিঠি পেয়েছিলেন। সেই চিঠিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির কথা জানিয়ে তাঁকে কয়েকটি দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়েছিল। নরেন্দ্র মোদীর কাছে সেটি ছিল স্মরণীয় ঘটনা।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর লেখায় জানিয়েছেন, কয়েক দশক ধরে অশোক সিংঘল দিন-রাত পরিশ্রম করেছেন। দেশের প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় দীর্ঘ সফর করতেন তিনি। বিশেষ করে গুজরাটের আদিবাসী এলাকাগুলিতে যাওয়ার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল।
সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য আরও কী করা যায়, তা নিয়ে তিনি সবসময় ভাবতেন বলে জানিয়েছেন মোদী। কোনও জায়গায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে তিনি এগিয়ে যেতেন। ২০০১ সালের কচ্ছ ভূমিকম্পের পর অশোক সিংঘলের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও স্মরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
অশোক সিংঘল একটি সমৃদ্ধ ও পরিচিত পরিবারে জন্মেছিলেন। তাঁর বাবা মহাবীর সিংঘল ছিলেন একজন বিশিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিক। তাঁর ভাই বিপি সিংঘল পুলিশ আধিকারিক হওয়ার পর সাংসদও হন। আরেক ভাই ভিপি সিংঘল ত্রিপুরা রাজ্য গঠনের পর সেখানকার মুখ্যসচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
তবে ছোটবেলা থেকেই অশোক সিংঘলের আগ্রহ ছিল সমাজ এবং দেশের কাজে। প্রয়াগরাজে বড় হওয়ার সময় তিনি দীর্ঘক্ষণ সঙ্গমের তীরে বসে থাকতেন। সেখানে সাধু-সন্ত ও ভক্তদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ভারতীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দেয় বলে মোদী উল্লেখ করেছেন। পরবর্তীতে মানুষের জন্য কাজ করার এই মানসিকতা তাঁকে আরএসএস (RSS)-এর সঙ্গে যুক্ত করে।
অশোক সিংঘল দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে কাজ করেছেন। তাঁর শক্তিশালী বক্তৃতা এবং মানুষের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ তৈরি করার ক্ষমতার কথাও স্মরণ করেছেন মোদী। একইসঙ্গে সংগঠনের কর্মীদের প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত যত্ন এবং সরল জীবনযাপনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন সাধু-সন্তের সঙ্গেও অশোক সিংঘলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হত বলে লেখায় উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
অশোক সিংঘলের সাংগঠনিক দক্ষতার উদাহরণ হিসেবে দুটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন মোদী। ১৯৯৩ সালে আমেরিকায় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের উদ্যোগে স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতার ১০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটি সম্মেলন আয়োজন করা হয়েছিল। বিদেশের মাটিতে এত বড় অনুষ্ঠান আয়োজন এবং বিভিন্ন পক্ষকে একত্রিত করার ক্ষেত্রে অশোক সিংঘলের ভূমিকার কথা স্মরণ করেছেন তিনি।
এরপর ২০০০ সালে ত্রিনিদাদ ও টোবাগোর পোর্ট অব স্পেনে বিশ্ব হিন্দু সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও অশোক সিংঘলের উপস্থিতি প্রতিনিধিদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি করেছিল বলে জানিয়েছেন মোদী।
অশোক সিংঘলের নাম উঠলে রাম জন্মভূমি আন্দোলনের প্রসঙ্গও আসে। মোদীর লেখায় ১৯৯১ সালের বোট ক্লাবের সভায় অশোক সিংঘলের বক্তৃতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আন্দোলনের সময় তাঁর আহত অবস্থার ছবির কথাও স্মরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী। মোদীর বক্তব্য, “অযোধ্যায় রাম মন্দির নির্মাণের যে উদ্যোগ পরবর্তীতে বাস্তব রূপ পেয়েছে, তার পিছনে অশোক সিংঘলের মতো ব্যক্তিদের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টা ছিল।” তিনি বেঁচে থাকলে অযোধ্যায় রাম মন্দির তৈরি হতে দেখে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হতেন বলেও লিখেছেন প্রধানমন্ত্রী।
অশোক সিংঘলের চিন্তাভাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে সামাজিক ঐক্য ও সমতার কথা তুলে ধরেছেন মোদী। তাঁর মতে, সমাজে কোনও ধরনের বৈষম্য থাকা উচিত নয় এবং প্রত্যেক মানুষের সমান সম্মান পাওয়া উচিত—এই ভাবনাতেই বিশ্বাসী ছিলেন অশোক সিংঘল।
অযোধ্যায় রাম মন্দিরের প্রথম ইট বসানোর দায়িত্ব প্রান্তিক সমাজের মানুষ কামেশ্বর চৌপালের হাতে দেওয়ার ভাবনার কথাও লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি কাশীতে ধর্ম সংসদের সময় ডোম রাজার সম্মান জানানোর উদ্যোগের কথাও স্মরণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশ ও সমাজের জন্য কাজের পাশাপাশি শিক্ষা, বিশেষ করে বৈদিক শিক্ষার প্রতি অশোক সিংঘলের বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে (BHU) পড়াশোনা করেছিলেন। একল বিদ্যালয় উদ্যোগের সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। প্রত্যন্ত গ্রাম এবং বিশেষ করে আদিবাসী এলাকার শিশুদের কাছে প্রাথমিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ কাজ করত। অশোক সিংঘল নিয়মিত পড়াশোনা করতেন এবং তরুণ কর্মীদেরও বেশি করে পড়ার পরামর্শ দিতেন বলে জানিয়েছেন মোদী।
তবে শুধু সংগঠন বা সমাজসেবাই নয়, সংগীতের প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। নাগপুরে বিভিন্ন বৈঠকে তাঁকে ‘একল গীত’ গাইতে শুনেছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৫ সালে তাঁর ৯০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ‘হে মাতৃভূমি মেরি, হে পিতৃভূমি মেরি’ গান গাওয়ার একটি ভিডিওও সেই সময় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল।
অশোক সিংঘলের জন্মশতবর্ষে প্রধানমন্ত্রী তাঁর জীবন, চিন্তাভাবনা এবং সমাজের জন্য তাঁর কাজকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর লেখার শেষাংশে মোদী অশোক সিংঘলের দেখানো পথে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করার সংকল্প নতুন করে নেওয়ার কথা বলেছেন।