PM Narendra Modi on Somnath Temple: সোমনাথ মন্দিরের অজানা কাহিনি নিয়ে কলম ধরলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কী লিখলেন পড়ুন
PM Narendra Modi on Somnath Temple: প্রধানমন্ত্রী লিখেছেন, "আমার মনে পড়ে ২০০১ সালের অক্টোবর মাসের কথা, যখন আমি সদ্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছি। ৩১ অক্টোবর, সর্দার প্যাটেলের জন্মজয়ন্তীতে, সোমনাথ মন্দিরের দ্বার খোলার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গুজরাট সরকার একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেই অনুষ্ঠানটি ছিল সর্দার প্যাটেলের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনেরও অংশ।"

নয়া দিল্লি: আধ্যাত্বিকতার সঙ্গে গভীর যোগ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। বিভিন্ন সময়ে তিনি দেশের নানা জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে সতীপীঠ দর্শন করেছেন তিনি। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর হৃদয়ের কাছে মন্দির হল সোমনাথ মন্দির। তিনি শ্রী সোমনাথ ট্রাস্টের চেয়ারম্যানও। আগামী ১১ মে প্রধানমন্ত্রী মোদী ফের সোমনাথ দর্শনে যাবেন। তার আগে সোমনাথ মন্দিরের গুরুত্ব নিয়ে কলম ধরলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রীর লেখনী-
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী লেখেন, “২০২৬ সালের শুরুতে আমি গিয়েছিলাম সোমনাথে, ‘সোমনাথ স্বাভিমান পর্বে যোগ দিতে। সেই অনুষ্ঠান ছিল সোমনাথ মন্দিরের উপরে প্রথম আক্রমণের এক হাজার বছর পূর্তি। এবার আগামী ১১ মে আমি আবারও সোমনাথ মন্দিরে যাব, পুনর্নির্মিত সোমনাথ মন্দিরের উদ্বোধনের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে। মাত্র ছ’মাসেরও কম সময়ে সোমনাথের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলকের সাক্ষী হওয়া আমার কাছে এক বিশেষ সৌভাগ্যের বিষয়। ধ্বংস থেকে সৃষ্টির পথে সোমনাথের যাত্রা—যাকে আমরা বলি ‘ধ্বংস থেকে সৃজন’—তারই এক জীবন্ত প্রতীক এই অনুষ্ঠানগুলি।”
“সোমনাথ আমাদের সভ্যতার এক চিরন্তন বার্তা দেয়। তার সামনে বিস্তীর্ণ সমুদ্র যেন সময়ের অনন্ত প্রবাহের কথা মনে করিয়ে দেয়। সমুদ্রের ঢেউ যেন বলে- ঝড় যতই ভয়ঙ্কর হোক, সময় যতই কঠিন হোক, আত্মসম্মান ও শক্তি নিয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো সম্ভব। প্রতিটি ঢেউ তীরে ফিরে এসে যেন আগামী প্রজন্মকে মনে করিয়ে দেয়—এই জাতির আত্মাকে কখনও দীর্ঘদিন দমিয়ে রাখা যায় না।”
“আমাদের প্রাচীন শাস্ত্রে বলা হয়েছে—“প্রভাসং চ পরিক্রম্য পৃথিবীক্রম সম্ভবম।” অর্থাৎ, দেবভূমি প্রভাস (সোমনাথ)-এর প্রদক্ষিণ করা মানে যেন সমগ্র পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার সমান পুণ্য অর্জন। যুগে যুগে মানুষ এখানে শুধু প্রার্থনা করতেই আসেননি, তাঁরা অনুভব করেছেন এমন এক সভ্যতার ধারাবাহিকতা, যার প্রদীপ কখনও নিভে যায়নি। সাম্রাজ্য এসেছে, সাম্রাজ্য হারিয়ে গিয়েছে, সময় বদলেছে, আক্রমণ হয়েছে আর অস্থিরতা এসেছে—তবু সোমনাথ ভারতীয় চেতনায় অটুট থেকেছে।”
“আজ সময় এসেছে সেই সব মহান ব্যক্তিত্বদের স্মরণ করার, যাঁরা অত্যাচারের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছিলেন। সোমা শর্মন প্রভাসকে দর্শনের এক মহান কেন্দ্রে পরিণত করেছিলেন। ভালভীর চক্রবর্তী মহারাজা ধারাসেন চতুর্থ সেখানে দ্বিতীয় মন্দির নির্মাণ করেন। ভীমদেব, জয়পাল ও আনন্দপাল সভ্যতার মর্যাদা রক্ষায় বিদেশি আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্য আজও স্মরণীয়।”
“কথিত আছে, রাজা ভোজও মন্দির পুনর্নির্মাণে সহায়তা করেছিলেন। কর্ণদেব ও সিদ্ধরাজ জয়সিংহ গুজরাটের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক শক্তি পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ভাব বৃহস্পতি, কুমারপাল সোলাঙ্কি এবং পাশুপত আচার্যরা সোমনাথকে পুনর্গঠন করে উপাসনা ও জ্ঞানচর্চার এক প্রধান কেন্দ্রে পরিণত করেন। বিশালদেব ভাগেলা ও ত্রিপুরান্তক এর আধ্যাত্মিক ও বৌদ্ধিক ঐতিহ্য রক্ষা করেছিলেন।”
“মহীপালদেব ও রা খাঙ্গার ধ্বংসের পর পুনরায় পূজার্চনা চালু করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অহল্যাবাই হোলকর, যার ৩০০তম জন্মবার্ষিকী পালিত হচ্ছে, কঠিনতম সময়েও ভক্তির ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন। বরোদার গায়কোয়াড় রাজবংশ তীর্থযাত্রীদের অধিকার রক্ষা করেছিল। আর আমাদের এই মাটিই জন্ম দিয়েছিল বীর হামিরজি গোহিল ও বীর ভেগদাজি ভিলের মতো সাহসী যোদ্ধাদের, যাঁদের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব আজও সোমনাথের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”
“১৯৪০-এর দশকে, যখন স্বাধীনতার চেতনায় ভারত উত্তাল এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মতো নেতাদের নেতৃত্বে নতুন প্রজাতন্ত্রের ভিত গড়ে উঠছিল, তখনও একটি বিষয় তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করত—সোমনাথের দুরবস্থা। ১৯৪৭ সালের ১৩ নভেম্বর, দীপাবলির সময়, তিনি ভগ্নপ্রায় সোমনাথ মন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের জল হাতে নিয়ে বলেছিলেন—“গুজরাটি নববর্ষের এই শুভ দিনে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সোমনাথ মন্দির পুনর্নির্মাণ করা হবে। সৌরাষ্ট্রের মানুষকে সর্বশক্তি দিয়ে এই পবিত্র কাজে অংশ নিতে হবে।” সর্দার প্যাটেলের সেই আহ্বানে শুধু গুজরাট নয়, গোটা ভারত সাড়া দিয়েছিল।”
“দুর্ভাগ্যবশত, সর্দার প্যাটেল তাঁর স্বপ্ন পূরণ হতে দেখে যেতে পারেননি। পুনর্নির্মিত সোমনাথ মন্দিরের দ্বার ভক্তদের জন্য খোলার আগেই তিনি প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর স্বপ্নকে এগিয়ে নিয়ে যান কে এম মুন্সি এবং নওয়ানগরের জামসাহেব। ১৯৫১ সালে মন্দির নির্মাণ সম্পূর্ণ হলে, উদ্বোধনের জন্য ভারতের রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর আপত্তি সত্ত্বেও ড. প্রসাদ অনুষ্ঠানে যোগ দেন এবং তা ঐতিহাসিক হয়ে ওঠে।”
“আমার মনে পড়ে ২০০১ সালের অক্টোবর মাসের কথা, যখন আমি সদ্য গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হয়েছি। ৩১ অক্টোবর, সর্দার প্যাটেলের জন্মজয়ন্তীতে, সোমনাথ মন্দিরের দ্বার খোলার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে গুজরাট সরকার একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। সেই অনুষ্ঠানটি ছিল সর্দার প্যাটেলের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনেরও অংশ। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লালকৃষ্ণ আডবাণীও উপস্থিত ছিলেন।”
“১৯৫১ সালের ১১ মে তাঁর বক্তৃতায় ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ বলেছিলেন, সোমনাথ মন্দির বিশ্বকে এই বার্তা দেয় যে অগাধ বিশ্বাস ও ভালোবাসাকে কখনও ধ্বংস করা যায় না। তিনি আশা প্রকাশ করেছিলেন, এই মন্দির মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবে। তিনি আরও বলেছিলেন, সোমনাথের পুনর্নির্মাণ সর্দার প্যাটেলের স্বপ্নপূরণ হলেও, প্রকৃত দায়িত্ব হল মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা। এই বার্তাগুলি আজও সমানভাবে অনুপ্রেরণাদায়ক।”
“গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমরা সেই পথেই এগিয়ে চলেছি। “বিকাশ ভি, বিরাসত ভি”—এই নীতিকে সামনে রেখে সোমনাথ থেকে কাশী, কামাখ্যা থেকে কেদারনাথ, অযোধ্যা থেকে উজ্জয়িনী, ত্র্যম্বকেশ্বর থেকে শ্রীশৈলম—দেশের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রগুলিকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধায় সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি তাদের ঐতিহ্যও সংরক্ষণ করার সুযোগ আমাদের হয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার ফলে আরও বেশি মানুষ এই স্থানগুলিতে যেতে পারছেন। এর ফলে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে, কর্মসংস্থান বাড়ছে এবং “এক ভারত, শ্রেষ্ঠ ভারত”-এর ভাবনাও আরও গভীর হচ্ছে।”
“সোমনাথকে রক্ষা করতে এবং পুনর্গঠনের জন্য যাঁরা আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের সংগ্রাম ও ত্যাগ কখনও ভোলা যাবে না। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য মানুষ সোমনাথের গৌরব ফিরিয়ে আনতে অবদান রেখেছেন। তাঁদের কাছে ভারতের প্রতিটি অংশই ছিল পবিত্র, এক অখণ্ড চেতনায় বাঁধা। বিভাজনে ভরা আজকের পৃথিবীতে এই ঐক্যের চেতনা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।”
“সোমনাথ চিরকাল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে, কারণ ঐক্য ও সভ্যতার চেতনা প্রতিটি ভারতীয়ের হৃদয়ে আজও জীবন্ত। এই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, এক হাজার বছরের অসাধারণ সাহসিকতাকে স্মরণ করে আগামী এক হাজার দিন ধরে সোমনাথে বিশেষ পূজার আয়োজন করা হবে। বহু মানুষ ইতিমধ্যেই এই পূজার জন্য দান করছেন, যা অত্যন্ত আনন্দের বিষয়।”
“আমি দেশবাসীর কাছে আবেদন জানাই—এই বিশেষ সময়ে একবার সোমনাথ ঘুরে আসুন। সোমনাথের সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে তার প্রাচীন ইতিহাসের প্রতিধ্বনি অনুভব করুন। সেখানে আপনি শুধু ভক্তির আবেগেই আপ্লুত হবেন না, অনুভব করবেন এমন এক সভ্যতার স্পন্দন, যা কখনও হার মানেনি, কখনও ভেঙে পড়েনি। আপনি উপলব্ধি করবেন ভারতের অদম্য আত্মাকে এবং বুঝতে পারবেন কেন শত আঘাতের পরও আমাদের সংস্কৃতি অপরাজিত থেকেছে। সেই অনন্ত বিজয়ের অনুভূতি সত্যিই অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
