
‘হঠাৎ মনে পড়ল, জীবনে প্রথমবার আজ আমি মোবাইল নিয়ে কোর্টরুমে ঢুকেছি।’
শুনানির মাঝে হঠাৎ বলে উঠলেন দেশের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। নজিরবিহীন তাই না? তবে এর থেকেও নজিরবিহীন সব আপডেট এসেছে কোর্টরুম থেকে। গোটা দেশের… থুড়ি শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়া সামলাচ্ছে দেশের শীর্ষ আদালত। মামলার শুনানি ছেড়ে রাজ্যের কয়েক’শ বিচারক ভোটার কার্ড-প্যান কার্ড চেক করেছেন। এবার বিচার করতে বসেছেন প্রাক্তন বিচারপতিরা। এত কিছুর পরও ফের কমিটি গড়তে হল সুপ্রিম কোর্টকে? ভোটের মুখে কমিশন যাঁকে নিযুক্ত করল, সেই মুখ্যসচিবকে কেন এত কড়া ভর্ৎসনার মুখে পড়তে হল?
নির্বাচন কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু করার পর রাজ্য সরকারের সঙ্গে এমন সংঘাত শুরু হল যে আসরে নামতে বাধ্য হল সুপ্রিম কোর্ট। নজিরবিহীনভাবে সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত করল রাজ্যের বিভিন্ন আদালতের বিচারকদের। দায়িত্ব দেওয়া হল কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতিকে। জুডিশিয়াল অফিসার হিসেবে কাজ করলেন বিচারকরা। কালিয়াচকের মতো ঘটনার মুখোমুখি হতে হল তাঁদের। দেশের প্রাক্তন বিচারপতি, বিচারকরা এবার ট্রাইব্যুনালে বসছেন। এরপর আবারও তৈরি হচ্ছে আরও একটা কমিটি। এই বিরাট কর্মকাণ্ডের মাঝেও সোমবারের শুনানিতে উঠে এল একটার পর একটা প্রশ্ন।
সোমবার প্রথমেই প্রশ্ন ছুড়তে শুরু করেন রাজ্যের আইনজীবী শ্যাম দিওয়ান। সিনিয়র আইনজীবী। একাধিক সাংবিধানিক মামলা লড়েছেন। ডেটা তুলে ধরে দিওয়ান প্রশ্ন করতে থাকেন,
“৪৫ শতাংশ নাম বাদ পড়েছে, সংখ্যাটা কিন্তু অনেকটাই বেশি। ৭ লাখ বাদ পড়া ভোটার আবেদন করেছে। অ্যাপিলেট ট্রাইব্যুনাল এখনও কাজই শুরু করল না! এটা তো উদ্বেগজনক। আবেদনকারীদের লম্বা লাইন পড়ছে। চরম সমস্যায় পড়েছেন ভোটাররা।”
তিনি প্রস্তাব দেব, ১৫ এপ্রিল কাট অফ ডেট ধার্য করা হোক। তারপরও যাঁদের আবেদন পেন্ডিং হয়ে থাকবে, তাঁদের ভোট দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হোক। জয়মাল্য বাগচী আশ্বত করে থামান তাঁকে। তবে অর্ডার পেন্ডিং থাকলে, ভোট দিতে দেওয়ার প্রস্তাবে রাজি হননি তিনি।
দিওয়ান উদ্বেগ প্রকাশ করতেই আদালতে আবারও পুরনো সংঘাতের কথা মনে করাল কমিশন। আইনজীবী ডিএস নাইডু মনে করিয়ে দিলেন, রাজ্যই তো অফিসার দিতে পারেনি। দিওয়ানের সঙ্গে গলা মেলান আরও এক সিনিয়র আইনজীবী কপিল সিব্বল। বলে ওঠেন, ‘এটা ভোটাধিকারের প্রশ্ন।’
রাজ্যের তরফে আর এক আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় উল্লেখ করেন, আরও এক নতুন সমস্যার কথা। আবেদন লেখার জায়গাই নেই ওয়েবসাইটে। জমা দেওয়া ডকুমেন্টসের কোনও রিসিপ্টও দেওয়া হচ্ছে না।
এসব শুনে ফের উদ্বিগ্ন সুপ্রিম কোর্ট। এত বিচারক, প্রাক্তন বিচারপতিদের এসআইআর প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেও সমস্যার শেষ নেই। এবার আরও একটা কমিটি। কারা থাকবেন? সিনিয়র জাজেস অর্থাৎ সিনিয়র বিচারপতিরা। টিম বা কমিটি তৈরি করে দেবেন হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল। সুপ্রিম কোর্ট মনে করিয়ে দিয়েছে, প্রাক্তন বিচারপতিদের সাম্মানিক দিতে যেন দেরী না হয়।
এখানেই শেষ নয়, বাংলার প্রশাসনের দায়িত্ব বোঝাতে হল সুপ্রিম কোর্টকে। প্রশাসনিক অফিসারদের গাফিলতি নিয়ে চরম ভর্ৎসনা শোনা গেল সুপ্রিম কোর্টে। সোমবার ভার্চুয়াল মাধ্যমে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব দুষ্যন্ত নারিওয়ালা। কালিয়াচকের ঘটনার সময় তাঁকে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি নাকি ফোন ধরেননি। নারিওয়ালা যখন উত্তর দেন, তিনি ফ্লাইটে ছিলেন, তাই ফোন ধরতে পারেননি। তারপর আরও কড়া হতে শুরু করে বিচারপতিদের স্বর। এমনকী কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে ক্ষমা চাইতে বলা হয় তাঁকে। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, “নিষ্ক্রিয়তার একটা লিমিট থাকা উচিত।” “আপনার পদমর্যাদা এতটাই বেশি যে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির মতো ছোট মানুষরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন না। দয়া করে নিজেকে একটু নীচে নামিয়ে আনুন, যাতে প্রধান বিচারপতির মতো সাধারন নগণ্য মানুষেরা আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে।”
এই মামলা ও এসআইআর সংক্রান্ত বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সঙ্গে এত কথা বলতে হচ্ছে প্রধান বিচারপতিকে যে এই মামলার জন্য মোবাইল নিয়ে কোর্টরুমে ঢুকতে বাধ্য হয়েছেন প্রধান বিচারপতি। এতকিছুর পরও একটাই প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে, সবাই ভোটটা দিতে পারবেন তো? যাঁদের নাম বাদ পড়ল, তাঁরা এবার কি ভোটটা দিতে পারবেন? এই উত্তর জানতে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।