Health Outcomes in India: ভারতে আপনি কোথায় থাকেন, তার উপর আপনার স্বাস্থ্য নির্ভর করে কেন?
State-wise Health Disparities: ভারতে একজন মানুষ কোথায় থাকেন, তার উপরেই অনেকটা নির্ভর করে তাঁর স্বাস্থ্য পরিষেবার মান ও সুস্থতার পরিমাপ। আজকের ‘YOUR INDIA’ কলামে সন্তোষ নায়ার লিখছেন, শিশুমৃত্যুর হার, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং সামাজিক পরিস্থিতি কীভাবে দেশের এক একটি রাজ্যকে অন্য রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর করে তুলেছে।

আজকের কেরলে জন্ম নেওয়া একটি শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ইউরোপের কোনও উন্নত দেশের শিশুর মতো। অন্যদিকে, একই বছরে উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ বা ছত্তীসগঢ়ের কোনও এলাকায় জন্ম নেওয়া শিশুর শৈশবেই মৃত্যুর ঝুঁকি সুদানের মতো দেশের ক্ষেত্রে গবেষকদের পাওয়া পরিসংখ্যানের কাছাকাছি। দুটি শিশুই জন্মেছে একই দেশের সরকারের অধীনে, একই সংবিধান ও একই জাতীয় পতাকার ছায়ায়। অথচ জীবনের প্রথম বছরটি পেরিয়ে বেঁচে থাকার সম্ভাবনার ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
ভারতে প্রতি ১,০০০ জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যুর জাতীয় হার প্রায় ২৫। কেরলে এই হার মাত্র ৫। অন্যদিকে, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ ও ছত্তীসগঢ়ে এই হার ৩৭। অর্থাৎ, একই দেশের মধ্যে একই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যনীতির আওতায় থেকেও কেরলের তুলনায় এই রাজ্যগুলিতে শিশুমৃত্যুর হার সাত গুণেরও বেশি।
একই দেশের মধ্যে স্বাস্থ্য পরিষেবার ফলাফলে এত বড় পার্থক্য কেন?
আসলে, বিষয়টি কোনও একটি জায়গায় চিকিৎসকেরা বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেন, আর অন্য জায়গায় করেন না—এমন নয়। বরং স্বাস্থ্য পরিষেবাকে ঘিরে থাকা সামগ্রিক পরিস্থিতিই এখানে বড় ভূমিকা নেয়। অনেক সময় হাসপাতালের বাইরের বিষয়গুলি হাসপাতালের ভিতরের পরিষেবার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কেরলের এই সাফল্য এক দিনে আসেনি। কয়েক দশক ধরে মহিলাদের উচ্চ সাক্ষরতার হার, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবায় ধারাবাহিক বিনিয়োগ, উন্নত পয়ঃপ্রণালী ও নিকাশি ব্যবস্থা এবং গ্রামস্তর পর্যন্ত সরকারি পরিষেবা পৌঁছে দিতে সক্ষম শক্তিশালী স্থানীয় প্রশাসন—এই সবকিছুর সম্মিলিত ফল কেরলের উন্নত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্য পরিষেবায় পিছিয়ে থাকা রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে প্রায়ই দেখা যায় এর বিপরীত ছবি। মহিলাদের সাক্ষরতার হার তুলনামূলক কম, গ্রামীণ পরিকাঠামো দুর্বল এবং বিস্তীর্ণ ও ছড়িয়ে থাকা জনবসতির জন্য স্বাস্থ্য পরিষেবার উপর প্রবল চাপ।
একটি সাধারণ পরিস্থিতির কথা ভাবুন। কোনও গ্রামের কাছে যদি কার্যকর প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকে, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়মিত গর্ভবতী মায়ের খোঁজখবর নেন এবং বর্ষার সময়েও ব্যবহারযোগ্য রাস্তা থাকে, তা হলে সেই মায়ের সন্তান প্রসবের অভিজ্ঞতা অনেকটাই আলাদা হবে। অন্যদিকে, একই পরিস্থিতিতে গর্ভবতী হলেও কাছাকাছি এই সুবিধাগুলি না থাকলে অন্য এক মায়ের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে।
দুই মায়ের কেউই তাঁর সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে কম চিন্তিত নন। কিন্তু তাঁদের চারপাশের পরিস্থিতি সেই উদ্বেগের ভিত্তিতে পদক্ষেপ করার সুযোগ দু’জনকে সমানভাবে দেয় না।
স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ধারক কী?
এই কারণেই জনস্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ধারক’ ধারণাটি। এই ধারণা অনুযায়ী, শিক্ষা, পরিচ্ছন্নতা, আয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকারিতা—স্বাস্থ্যের ফলাফল নির্ধারণে হাসপাতালের শয্যাসংখ্যার মতোই গুরুত্বপূর্ণ, এমনকী কখনও কখনও তার চেয়েও বেশি। যেমন, কোনও হাসপাতাল অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতিতে সজ্জিত হলেও সেখানে পৌঁছতে যদি অনির্ভরযোগ্য রাস্তা ধরে এক ঘণ্টা লাগে, তা হলে বাস্তবে তার গুরুত্ব কমে যেতে পারে। তার তুলনায়, পাঁচ মিনিটের দূরত্বে থাকা অপেক্ষাকৃত সাধারণ পরিকাঠামোর একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, যেখানে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়মিত পরিষেবা দেন, অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ব্যক্তিগত উদ্যোগ বা পরিবারের সিদ্ধান্তের কোনও গুরুত্ব নেই। সব জায়গাতেই এগুলির গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু ভারতের দুটি রাজ্যের মধ্যে শিশুর বেঁচে থাকার সম্ভাবনায় সাত গুণেরও বেশি পার্থক্যকে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
এর পিছনে রয়েছে কয়েক দশকের বিনিয়োগের পার্থক্য, প্রশাসনিক দক্ষতার ফারাক এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন প্রাথমিক অবস্থান। ব্যক্তিগত পরিবারগুলি এই পরিস্থিতি তৈরি করেনি, আবার এককভাবে তা বদলে দেওয়ার ক্ষমতাও তাদের অধিকাংশের নেই।
স্বাস্থ্য সংক্রান্ত খবর পড়ার ক্ষেত্রেও এখান থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। ভারতের সামগ্রিক শিশুমৃত্যুর হারের মতো জাতীয় পরিসংখ্যান শুনলে মনে হতে পারে, গোটা দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির ছবিটা একই রকম। কিন্তু বাস্তবে তা খুব কম ক্ষেত্রেই সত্যি।
প্রায় প্রতিটি জাতীয় স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানের পিছনে লুকিয়ে থাকে স্থানীয় পরিস্থিতির বিস্তর পার্থক্য। কোনও কোনও জায়গা আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্য পরিষেবার কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছে। আবার কোথাও কয়েক দশকের চেষ্টা ও বিনিয়োগ সত্ত্বেও নানা সমস্যা রয়ে গিয়েছে।
আপনি যেখানে থাকেন, সেই জায়গাটি কতটা স্বাস্থ্যকর?
ভারতের যে কোনও প্রান্তের নাগরিকের কাছেই এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে দোষারোপ করার জন্য নয়, বরং নিজের এলাকার স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে আরও নির্দিষ্ট প্রশ্ন তোলার জন্য। জাতীয় গড় পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় না, আপনার জেলার প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত কর্মী রয়েছেন কি না, জরুরি পরিস্থিতিতে নিকটবর্তী হাসপাতালে বাস্তবে পৌঁছনো সম্ভব কি না, কিংবা স্থানীয় প্রশাসন স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ অর্থকে সময়মতো মানুষের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার কাজে ব্যবহার করতে পারছে কি না।
পরের বার যখন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভারতের জাতীয় স্বাস্থ্য পরিসংখ্যান তুলে ধরা হবে, তখন তার পাশাপাশি আরও একটি সহজ অথচ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা যেতে পারে।
ভারত কতটা স্বাস্থ্যকর, শুধু সেই প্রশ্ন নয়। বরং, আমি যেখানে থাকি, সেই নির্দিষ্ট জায়গাটি কতটা স্বাস্থ্যকর? আর কেন?
সূত্র: Data For India-র ২০২৩ সালের রাজ্যভিত্তিক শিশুমৃত্যুর হার সংক্রান্ত বিশ্লেষণ; কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রকের National Family Health Survey-র রাজ্যভিত্তিক স্বাস্থ্য সূচক; ভারতে স্বাস্থ্যের সামাজিক নির্ধারক এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার বৈষম্য সংক্রান্ত গবেষণা।
