
নয়া দিল্লি: বঙ্গের রাজনীতিতে টানটান উত্তেজনা। ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে হারের পর তৃণমূল কংগ্রেসে (TMC) যে ভাঙন ধরেছে, তাতে শুধু রাজ্যের নয়, দেশের রাজনীতিও তোলপাড় হচ্ছে। এর মধ্যেই বড় চমক। এক হয়ে যেতে পারে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস? তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-কে কংগ্রেসে (Congress) যোগদানের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, এমনটাই সূত্রের খবর। মমতাকে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সহ সভাপতি হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন সনিয়া গান্ধী (Sonia Gandhi) বলে কংগ্রেস সূত্রে খবর। তবে প্রশ্ন উঠছে কেন এই পথে হাঁটতে হচ্ছে মমতাকে?
ছাত্রাবস্থায় কংগ্রেস করতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। রাজীব গান্ধীর স্নেহভাজন ছিলেন তিনি। ১৯৯১ সালে মন্ত্রীও ছিলেন। পরে কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধ বাধে। তৈরি হয় দূরত্ব। শেষে ১৯৯৮ সালে তিনি কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। তৈরি করেন তৃণমূল কংগ্রেস। সেই কংগ্রেসেই আবার ২৮ বছর পর ফেরার জল্পনা শোনা যাচ্ছে। তবে এর পিছনে রয়েছে রাজনীতির জটিল অঙ্ক।
বিধানসভা নির্বাচনে ধরাশায়ী হওয়ার পর তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে খণ্ড খণ্ড হয়েছে। প্রথম ভাঙন ধরান ঋতব্রত। বিধানসভায় ঋতব্রতের হাত ধরে ৬৪ জন বিধায়ক আলাদা তৃণমূল গড়ার চেষ্টা করছে। তারা নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করতে পারে। আদালতে যদি এরা যদি নিজেদের আসল তৃণমূল দাবি করে, তবে দলের প্রতীকও পেয়ে যেতে পারে। দলের টাকা থেকে শুরু করে যাবতীয় অধিকার তাদের হাতে চলে যাবে। দলত্যাগ বিরোধী আইনও প্রয়োগ করা যাবে না যেহেতু তাদের হাতেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ঠিক যেমনটা মহারাষ্ট্রে হয়েছিল।
এদিকে, লোকসভা-রাজ্যসভাতেও ভাঙন ধরছে। লোকসভায় তৃণমূলের ২৮ জন সাংসদ আছে। রাজ্যসভায় তৃণমূলের সাংসদের সংখ্যা ১৩। লোকসভায় তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে ২০ জন সাংসদ আলাদা ব্লক তৈরি করতে চাইছেন। তারা সমর্থন জানাবে এনডিএ-কে। রাজ্যসভার সাংসদদের একাংশও দল ছাড়ছে, পদ ছাড়ছে। ইতিমধ্যেই ইস্তফা দিয়েছেন সুখেন্দু শেখর রায়, সুস্মিতা দেব। সদ্য রাজ্যসভার সাংসদ হওয়া কোয়েল মল্লিকের ইস্তফাও এখন সময়ের অপেক্ষা।
দল যাতে হাতছাড়া না হয় এবং এনডিএ-র হাত শক্তিশালী না হয়, তার জন্যই কি তৃণমূলের এই স্ট্র্যাটেজি? এর জন্য বুঝতে হবে দলত্যাগ বিরোধী আইন। কী এই আইন? কোনও সাংসদ বা বিধায়ক যদি এক দলের টিকিটে জেতার পর অন্য দলে যোগ দেন, তবে তাঁর সেই পদ খারিজ করার যে আইনি ব্যবস্থা রয়েছে, তাকেই দলত্যাগ বিরোধী আইন বলা হয়। ভারতীয় রাজনীতিতে দুর্নীতি কমানো এবং সরকারের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য এই আইনটি আনা হয়েছিল।
কোনও সদস্য দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় পড়ছেন কি না, সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন সংশ্লিষ্ট কক্ষের প্রিসাইডিং অফিসার অর্থাৎ লোকসভা বা বিধানসভার ক্ষেত্রে স্পিকার এবং রাজ্যসভার ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান। তবে স্পিকারের এই সিদ্ধান্তকে পরবর্তীতে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।
এই আইনটিতে বিশেষ ছাড়ও রয়েছে, যা দল ভাঙার ক্ষেত্রে সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে। সেটি হল দুই-তৃতীয়াংশের নিয়ম। যদি কোনও রাজনৈতিক দলের মোট নির্বাচিত সদস্যের অর্থাৎ সাংসদ বা বিধায়ক অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অংশ দল ছেড়ে অন্য কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত হতে চান বা একীভূত (Merger) হতে চান, তবে তাঁদের পদ খারিজ হয় না।
এখন তৃণমূলের যা অবস্থা, তাতে ঋতব্রত শিবির বা কাকলির শিবির- কাউকেই দলত্যাগ বিরোধী আইনের আওতায় ফেলতে পারবে না মমতার তৃণমূল কংগ্রেস। তবে সেখানেই যদি মমতা বন্দ্য়োপাধ্যায় কংগ্রেসের সঙ্গে এক হয়ে যান, তাহলে সাংসদ সংখ্যা কমবে না, উল্টে বাড়বে। তখন কাকলি সহ ২০ সাংসদের বিরুদ্ধে দলত্য়াগ বিরোধী আইনে অভিযোগ করা যাবে এবং তাদের সাংসদ পদও খারিজ হতে পারে। তবে রাজ্য বিধানসভার ক্ষেত্রে তা হবে না, কারণ তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়কের সংখ্যা বেশি। কংগ্রেসে যোগ দিলেও দুই তৃতীয়াংশের সংখ্যায় পৌঁছতে পারবে না। আপাতত লোকসভা ও রাজ্যসভায় ঘর বাঁচাতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২৮ বছর পর কংগ্রেসে ফিরতে পারেন।