
নয়া দিল্লি: বিরোধীদের ভোটাভুটিতে খারিজ হয়ে গেল ১৩১ সংবিধান সংশোধনী বিল। মহিলা সংরক্ষণ বিলে দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল না NDA। বিলটি পাশের জন্য NDA-এর প্রয়োজন ছিল ৩২৬টি ভোট। ভোটাভুটিতে অংশ নেন ৪৮৯ জন সাংসদ। বিলের বিপক্ষে ভোট পড়েছে ২৭৮। বিলের পক্ষে ভোট ২১১। অর্থাৎ হেরে গেল কেন্দ্র। মোদী সরকারের জন্য ধাক্কা। কিন্তু এমনটা যে হবে, সেটা প্রত্যাশিত ছিল নরেন্দ্র মোদী সরকারের কাছেও। সংবিধান সংশোধনী বিল পাশ করাতে যে দুই তৃতীয়াংশ সমর্থন তাঁরা পাবেন না, তা আঁচ আগেই করেছিলেন মোদী। আর সে আভাস নিজেও দিয়েছিলেন। তাহলে কি সংসদে হেরে ভোটের ময়দানে ফায়দা লুটতে চেয়েছে বিজেপি?
সংসদে মোদী
সংসদে দাঁড়িয়েই মোদী বলেছিলেন, “মহিলাদের সংরক্ষণের জন্য এই বিলের যাঁরা যাঁরা বিরোধিতা করেছেন, দেশের মহিলারা তাঁদের ক্ষমা করেনি। তাদের হাল খারাপ হয়েছে। কিন্তু এটাই দেখার ছব্বিশের নির্বাচনে এটা হয়নি। ছব্বিশে সবাই সহমত দিয়েছিলেন।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, তাহলে কি এটাই চেয়েছে বিজেপি? বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা, হয়তো এটা চেয়েছে মোদী সরকার। পাঁচ রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিধানসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রের মোদী সরকার এটা বোঝাতে চেয়েছে, বিরোধীরা মহিলা বিরোধী।
‘মুড’ আঁচ
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাভুটির আগেই মহিলাদের ‘মুড’ আঁচ করেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। বিরোধীরা এক-কাট্টা করার চেষ্টা করছে, এটা আঁচ করেছিলেন শাহ। বিরোধীদের উদ্দেশেই শাহ বলেছিলেন, “আমাদের ওপর ভরসা রাখুন, বিল পাশ করতে দিন।” কিন্তু সেই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেছিলেন, “এটা দেশের অখণ্ডতার বিষয়, আমরা কখনই এটাকে সমর্থন করতে পারব না।”
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন নতুন করে মহিলা সংরক্ষণের প্রশ্ন আসছে?
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের বিলে ২০২৬-২৭ সালে যে জনগণনা হবে, তার ভিত্তিতে সারা দেশে যে জনসংখ্যা দাঁড়াবে, তার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। আর তার নিরিখে ৩৩ শতাংশ মহিলা আসন সংরক্ষণ করা হবে। বাংলা-তামিলনাড়ুর নির্বাচনের প্রাক্কালেই বিশেষ অধিবেশন ডেকে জানানো হয়, ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে আসন সংরক্ষণ করা হবে। পরবর্তীতে জানানো হয়, প্রত্যেক রাজ্যে এই মুহূর্তে লোকসভার যত আসন রয়েছে, তার ৫০ শতাংশ আসন বাড়বে। এই বিষয়ের ওপরেই নতুন করে ভোটাভুটি হচ্ছিল।
বাংলার ক্ষেত্রে ফায়দা কোথায়?
বাংলার ক্ষেত্রে গত বেশ কয়েকটি নির্বাচন, সেটা উনিশের হোক, একুশের, কিংবা চব্বিশের- দেখা গিয়েছে মহিলা ভোট তৃণমূলের ক্ষেত্রে এক কাট্টাভাবে পড়ছে। এবার বাংলার নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে যখন এই বিল পাশ হল না, তখন বিজেপির হাতে এই হাতিয়ার হল, মহিলার জন্য তৃণমূল সরকার সঠিক ভূমিকা পালন করছে না। তৃণমূল অবশ্যই ৩৩ শতাংশের অনেক বেশি মহিলা সদস্যকে লোকসভায় পাঠিয়েছে, কিন্তু আসন সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তৃণমূলকে পাশে পাওয়া যায়নি।
তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে সমীকরণ
তামিলনাড়ুর ক্ষেত্রে প্রচারের হাতিয়ার, DMK প্রথম থেকে এ কথা বলছে, তারা ডিলিমিটেশনের বিপক্ষে। গত কয়েক দশক ধরে তামিলনাড়ু-সহ দক্ষিণের কয়েকটা রাজ্যে জনসংখ্যা উত্তর ভারতের নিরিখে কমেছে। তার ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস হলে, আসনের সংখ্যাও উত্তর ভারতের তুলনায় কমবে। যেহেতু আসন পুনর্বিন্যাস ডিলিমিটেশনের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল, সেই কারণে বিরোধীরা বিরোধিতা করেছে। বিরোধীদের বক্তব্য, তারা মহিলা আসন সংরক্ষণের বিরোধী নয়, আসন পুনর্বিন্যাসের বিরোধী।
‘হার কর জিতনে বালোকো বাজিগর কহতে হ্যায়!’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মহিলা সংরক্ষণ বিলের এই পরাজয়কে বিজেপি আগামী নির্বাচনগুলোতে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ‘অস্ত্র’ হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। একদিকে মোদী সরকার নিজেদের নারীশক্তির প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসাবে তুলে ধরবে, অন্যদিকে বিরোধীদের বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেস এবং ডিএমকে-র মতো দলগুলোকে ‘নারী উন্নয়ন বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার কৌশল নেবে তারা।
বিজেপি ভোটারদের সামনে এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে চায় যে, তারা ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতেই আসন সংরক্ষণের প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করতে চেয়েছিল, কিন্তু বিরোধীদের বাধার কারণে তা সম্ভব হল না। বিশেষ করে বাংলার প্রেক্ষাপটে, যেখানে মহিলা ভোট তৃণমূলের প্রধান শক্তি, সেখানে বিজেপি প্রচার করবে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল মুখে সংরক্ষণের কথা বললেও বাস্তবে আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরিতে সায় দেয়নি। অর্থাৎ বিশ্লেষকদের কথায়, বিজেপি এটা প্রমাণ করতে চাইছে, ‘হার কর জিতনে বালোকো বাজিগর কহতে হ্যায়!’